জন্মগত হৃদরোগ কি ও কেন হয়?

Rate this post

জন্মগত হৃদরোগ মানেই ভয়ের কিছু নয়— অনেক শিশুই সময়মতো চিকিৎসায় সুস্থ জীবন পায়। এই রোগটি আসলে কী? জন্মগত হৃদরোগ (Congenital Heart Disease) বলতে বোঝায় হৃৎপিণ্ডের গঠনগত ত্রুটি যা শিশুর জন্মের সময় থেকেই থাকে। এটি গর্ভকালীন সময়েই তৈরি হয়, পরবর্তী জীবনে নয়। বিশ্বব্যাপী এটি সবচেয়ে সাধারণ জন্মগত ত্রুটিগুলোর একটি। বাংলাদেশেও অনেক শিশু এই নিয়ে জন্মায়, তবে সঠিক পরিচর্যা ও চিকিৎসার মাধ্যমে তারা সুস্থ থাকতে পারে।

Table of Contents

জন্মগত হৃদরোগ বলতে আসলে কী বোঝায়?

জন্মগত হৃদরোগ মানে হৃৎপিণ্ডের গঠনে কোনো ত্রুটি থাকা। যেমন— দেয়ালে ছিদ্র, ভাল্ভের সমস্যা, বা রক্তনালীর অস্বাভাবিক অবস্থান। নিচের টেবিলে কয়েকটি সাধারণ প্রকারভেদ ও তাদের লক্ষণ দেওয়া হলো:

জন্মগত হৃদরোগের সাধারণ প্রকারভেদ ও লক্ষণ
হার্টের ত্রুটির ধরন কী হয় সাধারণ লক্ষণ (শিশুতে)
ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট (VSD) হৃৎপিণ্ডের নিচের প্রকোষ্ঠ দুটির মাঝে ছিদ্র থাকে দ্রুত শ্বাস, ওজন কম বাড়া, বারবার শ্বাসকষ্ট
অ্যাট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট (ASD) উপরের প্রকোষ্ঠ দুটির মাঝে ছিদ্র থাকে সাধারণত প্রথমে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে, পরে ক্লান্তি দেখা দেয়
টেট্রালজি অফ ফ্যালট (TOF) চারটি ত্রুটি একসাথে: পালমোনারি আর্টারি সরু, অ্যাওর্টা ডান পাশে, ভেন্ট্রিকুলার ছিদ্র, ডান ভেন্ট্রিকল বড় জন্মের পর থেকেই নীলচে রং (সায়ানোসিস), শ্বাসকষ্ট, খেতে অসুবিধা
ট্রান্সপজিশন অফ গ্রেট আর্টারিজ (TGA) অ্যাওর্টা ও পালমোনারি আর্টারির অবস্থান উল্টো জন্মের পর দ্রুত নীলচে ভাব, অক্সিজেনের মাত্রা কম

এগুলো কয়েকটি উদাহরণ মাত্র; আরও অনেক ধরনের ত্রুটি রয়েছে। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কেন হয় জন্মগত হৃদরোগ? সম্ভাব্য কারণগুলো কী কী?

জন্মগত হৃদরোগের সঠিক কারণ সবসময় জানা যায় না। তবে কিছু বিষয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

  • জিনগত কারণ: পরিবারে কারো জন্মগত হৃদরোগ থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়।
  • ক্রোমোজোমগত সমস্যা: ডাউন সিনড্রোমের মতো কিছু জিনগত অবস্থায় হৃদরোগ বেশি দেখা যায়।
  • মায়ের স্বাস্থ্য: গর্ভাবস্থায় মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে বা রুবেলা সংক্রমণ হলে ঝুঁকি বাড়ে।
  • ওষুধ ও অন্যান্য: কিছু ওষুধ, মদ, ধূমপানও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তবে জোর দিয়ে বলতে চাই: অনেক ক্ষেত্রেই কোনো নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না। এটি কারও দোষ নয়। মায়ের কোনো ভুল নয়। তাই অপরাধবোধ না করে চিকিৎসার দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

গর্ভাবস্থায় কীভাবে শনাক্ত করা সম্ভব?

গর্ভাবস্থায় নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড (অ্যানোমালি স্ক্যান) সাধারণত ১৮-২২ সপ্তাহের মধ্যে করা হয়। এতে হৃৎপিণ্ডের বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়তে পারে। আরও নির্ভুল পরীক্ষা হলো ফিটাল ইকোকার্ডিওগ্রাফি, যা গর্ভের শিশুর হৃৎপিণ্ডের বিস্তারিত ছবি দেয়। বাংলাদেশের কিছু বিশেষায়িত কেন্দ্রে এই পরীক্ষা করা সম্ভব। যদি কোনো ত্রুটি শনাক্ত হয়, তাহলে শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মনে রাখবেন, শনাক্তকরণ মানেই শেষ নয়; বরং এটি চিকিৎসার প্রথম ধাপ।

জন্মের পর শিশুর কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন?

জন্মের পর শিশুর কিছু লক্ষণ দেখলে দ্রুত শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। যেমন:

  • শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া
  • ঠোঁট বা ত্বকের নীলচে রং (সায়ানোসিস)
  • বুকের দুধ বা ফর্মুলা খেতে কষ্ট হওয়া
  • খাওয়ার সময় ঘাম বা ক্লান্তি
  • বারবার শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ (নিউমোনিয়া)
  • ওজন কম বাড়া বা স্বাভাবিক বৃদ্ধি না হওয়া

তবে সব নীলচে শিশুই হৃদরোগী নয়; অনেক সময় ফুসফুসের সমস্যার কারণেও এমন হতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন জরুরি।

চিকিৎসা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা: কী করবেন, কী করবেন না?

জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসা ত্রুটির ধরন ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে। কিছু ছোট ছিদ্র নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ দিয়ে ব্যবস্থাপনা করা হয়। জটিল ত্রুটির জন্য ক্যাথেটার পদ্ধতি বা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: নিজে থেকে কোনো ওষুধ বন্ধ বা শুরু করবেন না। শুধুমাত্র শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শই অনুসরণ করুন। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যায়। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে অনেক শিশুই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

বিভাগ অনুযায়ী হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন

আপনার বিভাগে অভিজ্ঞ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ খুঁজতে নিচের তালিকা দেখুন।

বিভাগ ডাক্তার খুঁজুন
ঢাকা ঢাকায় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে ভেরিফাইড হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা খুলনায় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রাজশাহী রাজশাহীতে ভেরিফাইড হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর রংপুরে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
সিলেট সিলেটে সেরা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
বরিশাল বরিশালে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে জনপ্রিয় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

জন্মগত হৃদরোগ কি বংশগত? অর্থাৎ বাবা-মায়ের কারো থাকলে সন্তানেরও হওয়ার সম্ভাবনা কি বেশি?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জন্মগত হৃদরোগের সুনির্দিষ্ট বংশগত কারণ পাওয়া যায় না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে জিনগত প্রভাব থাকতে পারে—যেমন যদি পরিবারের আগের কোনো সন্তানের বা নিকট আত্মীয়ের এই রোগ থাকে, তাহলে ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়। তবে এটি নিশ্চিত নয় যে বাবা-মায়ের কারো থাকলেই সন্তানের হবে। গর্ভকালীন স্ক্রিনিং ও জেনেটিক কাউন্সেলিং এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারেন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে।

গর্ভাবস্থায় কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন নিলে কি শিশুর জন্মগত হৃদরোগ হতে পারে?

কিছু কিছু ওষুধ ও সংক্রমণ (যেমন রুবেলা) গর্ভাবস্থায় হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে সব ওষুধই বিপজ্জনক নয়। গর্ভধারণের আগে ও গর্ভকালীন সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন না নেওয়াই ভালো। বিশেষ করে প্রথম তিন মাসে অত্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট ওষুধের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে আপনার গাইনোকোলজিস্ট বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন।

জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশু কি বড় হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে? যেমন খেলাধুলা, পড়াশোনা, চাকরি?

অনেক শিশুই সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। তবে রোগের ধরন ও তীব্রতার ওপর এটি নির্ভর করে। হালকা ত্রুটির ক্ষেত্রে শিশু সাধারণ খেলাধুলা ও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে (যেমন জটিল অপারেশন পরবর্তী) কিছু শারীরিক কার্যকলাপে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চেকআপ ও জীবনযাত্রার অভ্যাস মেনে চললে অনেক শিশুই ভালো থাকে।

বাংলাদেশে জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসার খরচ কেমন? সরকারি হাসপাতালে কি বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়া যায়?

চিকিৎসার খরচ রোগের জটিলতা, অপারেশনের ধরন ও হাসপাতালের ওপর নির্ভর করে। সরকারি হাসপাতালে (যেমন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) তুলনামূলক কম খরচে বা কিছু ক্ষেত্রে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বেসরকারি হাসপাতালে খরচ বেশি হতে পারে। অনেক সময় সরকারি উদ্যোগে শিশুদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রকল্পও থাকে। তাই প্রথমে একজন শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতাল বেছে নিন।

একটি সন্তানের জন্মগত হৃদরোগ থাকলে দ্বিতীয় সন্তানেরও এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি কতটুকু?

সাধারণত ঝুঁকি খুব বেশি নয়—প্রায় ২-৫% পর্যন্ত হতে পারে, তবে এটি নির্ভর করে প্রথম সন্তানের রোগের ধরন ও পরিবারের জিনগত ইতিহাসের ওপর। যদি কোনো নির্দিষ্ট জিনগত সিনড্রোম (যেমন ডাউন সিনড্রোম) থাকে, তাহলে ঝুঁকি বাড়ে। দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার আগে একজন জেনেটিক কাউন্সেলর ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উত্তম। গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং করিয়ে নিলে অনেক ক্ষেত্রেই আগেভাগে রোগ শনাক্ত করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: