হাত পা ও মুখের রোগ

Rate this post

শিশুর হঠাৎ জ্বর, গলাব্যথা আর হাত-পায়ে ছোট ছোট ফোস্কা দেখে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু চিন্তার কিছু নেই—হাত-পা-ও-মুখের রোগ (HFMD) বাংলাদেশে বর্ষা ও শরৎকালে শিশুদের মধ্যে দেখা যাওয়া একটি সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ। বেশিরভাগ শিশু ঘরোয়া যত্নেই ৭-১০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ সেরে ওঠে। এই লেখায় আমরা লক্ষণ, ঘরোয়া যত্ন, প্রতিরোধের উপায় এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে—সবকিছু সহজ ভাষায় আলোচনা করব।

হাত-পা-ও-মুখের রোগ কী এবং কেন হয়?

হাত-পা-ও-মুখের রোগ একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। সাধারণত কক্সস্যাকি ভাইরাস A16 এবং এন্টারোভাইরাস 71 (EV71) এর কারণে এই রোগ হয়। ভাইরাসটি আক্রান্ত শিশুর লালা, মল বা ফোস্কার তরলের মাধ্যমে অন্য শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। এটি খুব সহজেই ছড়ায়—হাঁচি-কাশি, ভাগ করা খেলনা, বা দূষিত হাতের মাধ্যমে।

বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষা ও শরৎকালে (জুন-সেপ্টেম্বর) এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়, তবে বড়রাও হতে পারে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এটি পশুর পা-ও-মুখের রোগ (Foot and Mouth Disease) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পশুর রোগটি পশুদের হয় এবং এটি মানুষে ছড়ায় না। তাই এ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি থাকলে দূর করুন।

লক্ষণগুলো কী কী?

প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • জ্বর: সাধারণত হালকা থেকে মাঝারি জ্বর (১০০-১০২°F) দিয়ে শুরু হয়।
  • গলাব্যথা ও মুখে ঘা: জ্বরের ১-২ দিন পর মুখের ভেতরে, বিশেষ করে জিভ, মাড়ি ও গালের ভেতরে ছোট ছোট লাল দাগ বা ফোস্কা দেখা যায়। এগুলো ব্যথার কারণে খাওয়া-দাওয়ায় সমস্যা করে।
  • হাত-পায়ে র্যাশ: হাতের তালু ও পায়ের পাতায় লাল দাগ বা ছোট ফোস্কা দেখা যায়। কখনও কখনও নিতম্বেও একই ধরনের র্যাশ হতে পারে।

কিছু শিশুর ক্ষেত্রে লক্ষণ খুব হালকা থাকে—শুধু জ্বর বা শুধু র্যাশ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় শিশু কোনো অভিযোগই প্রকাশ করতে পারে না। নিচের টেবিলে হাত-পা-ও-মুখের রোগ, চিকেনপক্স ও হামের লক্ষণগত পার্থক্য দেখানো হলো:

হাত-পা-ও-মুখের রোগ, চিকেনপক্স ও হামের মধ্যে পার্থক্য
বৈশিষ্ট্য হাত-পা-ও-মুখের রোগ চিকেনপক্স হাম
জ্বরের ধরন হালকা-মাঝারি, ২-৩ দিন মাঝারি-উচ্চ, ৩-৫ দিন উচ্চ জ্বর, ৪-৭ দিন
র্যাশের অবস্থান হাতের তালু, পায়ের পাতা, নিতম্ব; মুখের ভেতরে ঘা সারা শরীরে, বিশেষ করে মুখ ও ধড়ে মুখের ভেতরে সাদা দাগ (Koplik spots), তারপর কান থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে লাল র্যাশ
ফোস্কার ধরন ছোট, লাল দাগ, পরে ফোস্কা, ব্যথাহীন বা চুলকানি কম জলভর্তি ফোস্কা, খুব চুলকায়, পরে পুঁজ হয় ফোস্কা নয়, সমতল লাল দাগ, একত্রিত হতে পারে
অন্যান্য লক্ষণ গলাব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য ক্লান্তি, মাথাব্যথা চোখ লাল, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া
স্থায়িত্ব ৭-১০ দিন ৫-১০ দিন ৭-১০ দিন, কাশি বেশি দিন থাকে

ঘরোয়া যত্নে কী করবেন, কী করবেন না?

যেহেতু এই রোগের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, তাই ঘরোয়া যত্নই মুখ্য। নিচের টেবিলে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো:

করণীয় বর্জনীয়
প্রচুর তরল দিন: পানি, ডাবের পানি, স্যুপ, ফলের রস, অরস্যালাইন টক, ঝাল ও গরম খাবার এড়িয়ে চলুন
নরম ও ঠান্ডা খাবার দিন: দই, জাউ, ব্লেন্ডেড ফল, আইসক্রিম হার্ড বা ক্রিস্পি খাবার (চিপস, বিস্কুট) দেবেন না
জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল দিন (কখনো অ্যাসপিরিন নয়) অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিভাইরাল নিজে থেকে দেবেন না
মুখের ঘায়ের জন্য শিশুকে ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুতে দিন (যদি পারে) মুখের ঘায়ে কোনো ক্রিম বা স্প্রে নিজে থেকে ব্যবহার করবেন না
পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন শিশুকে স্কুলে বা অন্য শিশুর সংস্পর্শে পাঠাবেন না
হাত ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন প্রতিবার ডায়াপার পরিবর্তনের পর ফোস্কা ফাটানোর চেষ্টা করবেন না

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এতটুকু যত্নেই শিশু সেরে ওঠে। তবে কোনো অবস্থাতেই শিশুর বয়স ও ওজন অনুযায়ী ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ দেবেন না।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

যদি নিচের কোনো একটি লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে যান:

  • পানিশূন্যতা: শিশুর মুখ শুকিয়ে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া (৬ ঘণ্টায় একবারের কম), কান্না করলে চোখে পানি না আসা
  • জ্বর ৩ দিনের বেশি স্থায়ী হওয়া বা জ্বর খুব বেশি (১০৩°F-এর উপরে) থাকা
  • অস্বাভাবিক ঝিমুনি বা বিরক্তি: শিশু অতিরিক্ত নিস্তেজ বা অস্থির হয়ে পড়লে
  • খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্ট
  • ৬ মাসের কম বয়সী শিশু আক্রান্ত হলে—যেকোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

বিশেষ করে যদি শিশু পানি বা তরল একেবারেই খেতে না পারে, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে নিয়ে যান। মনে রাখবেন, বিরল ক্ষেত্রে ভাইরাসটি মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) বা মেনিনজাইটিস সৃষ্টি করতে পারে, তাই দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি।

প্রতিরোধের উপায় ও সাধারণ ভুল ধারণা

প্রতিরোধের জন্য করণীয়:

  • হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন—বিশেষ করে খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর এবং ডায়াপার পরিবর্তনের পর সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে হবে।
  • আক্রান্ত শিশুর আলাদা পাত্র, তোয়ালে ও খেলনা ব্যবহার করুন।
  • বাচ্চার স্কুল বা ডে-কেয়ারে জানিয়ে দিন, যাতে অন্যান্য শিশু সুরক্ষিত থাকে। সম্পূর্ণ সেরে না ওঠা পর্যন্ত (ফোস্কা শুকানো পর্যন্ত) বাড়িতে রাখুন।
  • বাড়ির মেঝে ও খেলনা জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করুন।

কয়েকটি সাধারণ ভুল ধারণা:

  • এটি পশুর রোগ: না, এটি পশুর পা-ও-মুখের রোগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়।
  • শুধু শিশুদের হয়: বড়রাও হতে পারে, তবে সাধারণত লক্ষণ হালকা হয়।
  • ভ্যাকসিন আছে বাংলাদেশে: বর্তমানে বাংলাদেশে হাত-পা-ও-মুখের রোগের কোনো ভ্যাকসিন প্রচলিত নয়। চীনে EV71 ভ্যাকসিন পাওয়া গেলেও তা এখানে নেই। তাই প্রতিরোধের মূল উপায় সঠিক স্বাস্থ্যবিধি।

বিভাগ অনুযায়ী শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন

আপনার শিশুর জন্য নিকটস্থ বিভাগের একজন অভিজ্ঞ শিশু বিশেষজ্ঞের সন্ধানে নিচের লিংকগুলো ব্যবহার করতে পারেন:

বিভাগ ডাক্তার খুঁজুন
ঢাকা ঢাকায় জনপ্রিয় শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে ভেরিফাইড শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা খুলনায় শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন
রাজশাহী রাজশাহীতে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর রংপুরে জনপ্রিয় শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
সিলেট সিলেটে ভেরিফাইড শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
বরিশাল বরিশালে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে জনপ্রিয় শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

হাত-পা-ও-মুখের রোগ কি ছোঁয়াচে? কীভাবে এটি ছড়ায়?

হ্যাঁ, এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। ভাইরাসটি আক্রান্ত শিশুর লালা, নাক-মুখের স্রাব, ফোস্কার তরল এবং মলের মাধ্যমে ছড়ায়। হাঁচি-কাশির সময় বাতাসে ভেসে আসা ড্রপলেট থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। তাই আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র (গ্লাস, খেলনা, তোয়ালে) আলাদা করা এবং ঘন ঘন সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া খুব জরুরি। বাড়ির অন্য শিশুদের সুরক্ষায় এই সতর্কতা মানা প্রয়োজন।

বড়রাও কি হাত-পা-ও-মুখের রোগে আক্রান্ত হতে পারেন?

হ্যাঁ, বড়রাও আক্রান্ত হতে পারেন, তবে শিশুদের তুলনায় ঝুঁকি কম। সাধারণত ভাইরাসটির সংস্পর্শে এলে প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরে আগে থেকেই কিছুটা প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। তবে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল (যেমন গর্ভবতী নারী, বয়স্ক বা দীর্ঘমেয়াদী রোগী) তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ হতে পারে এবং লক্ষণগুলো শিশুদের মতোই দেখা দিতে পারে। তাই পরিবারের কারো এই রোগ হলে সবাইকে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।

হাত-পা-ও-মুখের রোগ প্রতিরোধে কোনো টিকা বা ওষুধ আছে কি?

বর্তমানে বাংলাদেশে হাত-পা-ও-মুখের রোগের জন্য কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। প্রতিরোধের প্রধান উপায় হলো ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শ এড়ানো এবং ঘন ঘন সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া। কিছু দেশে ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে, তবে তা এখনও বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় না। তাই সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (যেমন হাত ধোয়া, আলাদা রাখা) মেনে চলাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: