রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার কারণ কী?

Rate this post

বিলিরুবিন একটি হলুদ রঞ্জক পদার্থ যা আমাদের শরীরে লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। সাধারণত লিভার এই বিলিরুবিনকে প্রক্রিয়াজাত করে পিত্তরসের মাধ্যমে অন্ত্রে পাঠিয়ে দেয়, যেখান থেকে তা মলের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। কিন্তু যখন এই প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যাঘাত ঘটে—যেমন লিভার ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, বা পিত্তনালীতে বাধা থাকে, বা রক্তকণিকা অস্বাভাবিক হারে ভাঙতে থাকে—তখন রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায়। বাংলাদেশে ‘জন্ডিস’ নামে পরিচিত এই অবস্থাটি আসলে বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার বাহ্যিক লক্ষণ। এই নিবন্ধে আমরা বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলো, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে তা নিয়ে আলোচনা করব।

Table of Contents

বিলিরুবিন কী এবং কেন এটি রক্তে বেড়ে যায়?

বিলিরুবিন মূলত দুই ধরনের: আনকনজুগেটেড (ইনডাইরেক্ট) এবং কনজুগেটেড (ডাইরেক্ট)। আনকনজুগেটেড বিলিরুবিন লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে তৈরি হয় এবং এটি পানিতে দ্রবণীয় নয়। লিভারে এটি কনজুগেটেড আকারে রূপান্তরিত হয়, যা পানিতে দ্রবণীয় এবং পিত্তরসের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো এই স্বাভাবিক চক্রের কোনো এক জায়গায় সমস্যা হয়েছে। সমস্যার অবস্থান অনুযায়ী কারণগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: লিভারের আগে (প্রি-হেপাটিক), লিভারের ভেতরে (হেপাটিক), এবং লিভারের পরে (পোস্ট-হেপাটিক)। নিচের টেবিলে প্রতিটি ধরনের মূল কারণ ও উদাহরণ দেওয়া হলো।

বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার তিনটি প্রধান কারণ (প্রি-হেপাটিক, হেপাটিক, পোস্ট-হেপাটিক)

বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার কারণ: প্রি-হেপাটিক, হেপাটিক ও পোস্ট-হেপাটিক
ধরন সমস্যার অবস্থান মূল কারণসমূহ (বাংলাদেশে সাধারণ) উদাহরণ
প্রি-হেপাটিক লিভারের আগে (রক্তে) লোহিত রক্তকণিকা অতিরিক্ত ভাঙা (হিমোলাইসিস) হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া, থ্যালাসেমিয়া, কিছু ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ
হেপাটিক লিভারের ভেতরে লিভারের কোষের ক্ষতি বা জিনগত সমস্যা ভাইরাল হেপাটাইটিস (বি, সি), অ্যালকোহলজনিত লিভার রোগ, ফ্যাটি লিভার, গিলবার্ট সিনড্রোম, সিরোসিস
পোস্ট-হেপাটিক লিভারের পরে (পিত্তনালী) পিত্তনালীতে বাধা পিত্তথলির পাথর, পিত্তনালীর ক্যান্সার, অগ্ন্যাশয়ের টিউমার

বাংলাদেশে ভাইরাল হেপাটাইটিস (বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি) এবং পিত্তথলির পাথর বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার খুব সাধারণ কারণ। অনেক সময় গিলবার্ট সিনড্রোমের মতো জিনগত অবস্থায়ও বিলিরুবিন কিছুটা বাড়তে পারে, যা সাধারণত নিরীহ এবং কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে যে কোনো ক্ষেত্রেই সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা করা জরুরি।

বিলিরুবিন পরীক্ষা: কখন, কেন এবং কীভাবে করা হয়?

যখন কারো চোখ বা ত্বক হলুদ দেখা যায়, বা প্রস্রাব গাঢ় হয়, অথবা লিভারের সমস্যার অন্যান্য লক্ষণ থাকে (যেমন ক্লান্তি, পেটে ব্যথা), তখন চিকিৎসক বিলিরুবিন পরীক্ষার পরামর্শ দেন। এই পরীক্ষাটি সাধারণত লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) প্যানেলের অংশ হিসেবে করা হয়। পরীক্ষার আগে ৮-১২ ঘণ্টা রোজা রাখার প্রয়োজন হতে পারে, তবে শুধু বিলিরুবিনের জন্য সবসময় রোজার প্রয়োজন হয় না—চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী চলুন।

রক্তের নমুনা শিরা থেকে নেওয়া হয় এবং ল্যাবে মোট বিলিরুবিন, ডাইরেক্ট (কনজুগেটেড) ও ইনডাইরেক্ট (আনকনজুগেটেড) বিলিরুবিনের মাত্রা মাপা হয়। ফলাফল বুঝতে সাহায্য করে যে সমস্যাটি লিভারের আগে, ভেতরে নাকি পরে। যেমন—ইনডাইরেক্ট বিলিরুবিন বেশি হলে প্রি-হেপাটিক কারণ (যেমন হিমোলাইসিস) বেশি সম্ভাবনাময়, আর ডাইরেক্ট বিলিরুবিন বেশি হলে হেপাটিক বা পোস্ট-হেপাটিক কারণ বেশি সম্ভাবনাময়। প্রয়োজনে আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি স্ক্যান বা লিভার বায়োপসিও করা হতে পারে।

বাংলাদেশে বিলিরুবিন পরীক্ষার খরচ (আনুমানিক)

বাংলাদেশে বিলিরুবিন ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার খরচ (প্রাইভেট ল্যাব)
পরীক্ষার নাম আনুমানিক খরচ (বাংলাদেশি টাকায়) মন্তব্য
মোট বিলিরুবিন (Total Bilirubin) ২০০-৪০০ টাকা শুধু বিলিরুবিনের জন্য আলাদা করলেও এই দাম
বিলিরুবিন ভগ্নাংশ (Direct & Indirect) ৩০০-৬০০ টাকা ডাইরেক্ট ও ইনডাইরেক্ট আলাদাভাবে জানতে
লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) প্যানেল ৫০০-১২০০ টাকা এতে বিলিরুবিন, ALT, AST, ALP ইত্যাদি থাকে
হেপাটাইটিস বি/সি অ্যান্টিজেন টেস্ট ৪০০-১০০০ টাকা কারণ নির্ণয়ে সহায়ক

উপরের খরচগুলো আনুমানিক এবং শহর, ল্যাবের মান ও প্যাকেজের ভিত্তিতে পরিবর্তিত হতে পারে। বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট ল্যাব বা হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ করে নিন।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

যদি আপনার বা আপনার পরিচিত কারো নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:

  • চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
  • প্রস্রাবের রং গাঢ় (চা বা কোলার মতো) হওয়া
  • মলের রং ফ্যাকাশে বা সাদাটে হয়ে যাওয়া
  • পেটের ডান পাশে ব্যথা বা অস্বস্তি
  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি, জ্বর, বা ওজন কমে যাওয়া
  • নবজাতকের ক্ষেত্রে: জন্মের ২-৩ দিন পর জন্ডিস দেখা দিলে এবং তা ২ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে বা খুব দ্রুত বাড়তে থাকলে

মনে রাখবেন, রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার অনেক কারণই চিকিৎসাযোগ্য। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা জটিলতা এড়াতে সাহায্য করে। নিজে থেকে কোনো ওষুধ বা ঘরোয়া চিকিৎসা শুরু করবেন না।

বিভাগ অনুযায়ী চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন

বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার কারণে ত্বক হলুদ হয়ে যেতে পারে (জন্ডিস)। যদিও মূল চিকিৎসা লিভার বা পিত্তনালীর সমস্যার ওপর নির্ভর করে, তবে ত্বকের পরিবর্তন নিয়ে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। নিচের টেবিলে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের তালিকা দেওয়া হলো:

বিভাগ ডাক্তার খুঁজুন
ঢাকা ঢাকায় জনপ্রিয় চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে টপ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা খুলনায় ভেরিফাইড চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রাজশাহী রাজশাহীতে ভেরিফাইড চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর রংপুরে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বিশেষজ্ঞ
সিলেট সিলেটে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বিশেষজ্ঞ
বরিশাল বরিশালে জনপ্রিয় চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে ভেরিফাইড চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

গিলবার্ট সিনড্রোম কী? এটি কি বিলিরুবিন বাড়ার একটি সাধারণ কারণ?

গিলবার্ট সিনড্রোম একটি জিনগত অবস্থা, যেখানে লিভার বিলিরুবিন প্রক্রিয়াজাত করতে কিছুটা ধীরগতি করে। এটি সাধারণত নিরীহ এবং বাংলাদেশে অনেকেরই অজানা থাকে। এই সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা মাঝে মাঝে সামান্য বেড়ে যায়, বিশেষ করে উপবাস, ডিহাইড্রেশন বা মানসিক চাপের সময়। তবে এটি কোনো রোগ নয় এবং সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে বিলিরুবিন বেড়ে গেলে অন্য কারণ বাদ দিতে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কোন ওষুধ সেবনে বিলিরুবিন বেড়ে যেতে পারে?

কিছু ওষুধ লিভারের এনজাইম কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে বিলিরুবিন বাড়াতে পারে। যেমন: প্যারাসিটামল (অতিরিক্ত মাত্রায়), কিছু অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন রিফাম্পিসিন), অ্যান্টি-ইপিলেপটিক ওষুধ (ফেনাইটোইন), এবং কিছু কেমোথেরাপি ওষুধ। এছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা স্টেরয়েডের মতো হরমোনজনিত ওষুধও কখনো কখনো বিলিরুবিনের মাত্রা পরিবর্তন করতে পারে। তবে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়; চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে বিকল্প ওষুধ বা ডোজ পরিবর্তন করা যেতে পারে।

ডিরেক্ট ও ইন্ডিরেক্ট বিলিরুবিনের পার্থক্য কী? কোনটি বেড়ে গেলে কী বোঝায়?

বিলিরুবিন দুই ধরনের: আনকনজুগেটেড (ইন্ডিরেক্ট) এবং কনজুগেটেড (ডিরেক্ট)। ইন্ডিরেক্ট বিলিরুবিন লোহিত রক্তকণিকা ভাঙার পর তৈরি হয় এবং এটি পানিতে দ্রবণীয় নয়। ডিরেক্ট বিলিরুবিন লিভারে প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর তৈরি হয় এবং পানিতে দ্রবণীয়। রক্তে ইন্ডিরেক্ট বিলিরুবিন বেড়ে গেলে সাধারণত রক্তকণিকা ভাঙার হার বেড়েছে (হিমোলাইসিস) বা লিভার সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারছে না। ডিরেক্ট বিলিরুবিন বেড়ে গেলে পিত্তনালীতে বাধা বা লিভারের কোষের ক্ষতি (হেপাটাইটিস) হতে পারে। পরীক্ষার রিপোর্টে কোন অংশ বেড়েছে তা দেখে চিকিৎসক কারণ নির্ণয়ের দিক নির্দেশনা পান।

জন্ডিসের লক্ষণ ছাড়াই কি বিলিরুবিন বাড়তে পারে? তাহলে কীভাবে বুঝব?

হ্যাঁ, বিলিরুবিনের মাত্রা সামান্য বাড়লে (সাধারণত ২-৩ মিগ্রা/ডিএল পর্যন্ত) চোখ বা ত্বকে হলদে ভাব নাও দেখা যেতে পারে। এই অবস্থাকে ‘সাবক্লিনিক্যাল জন্ডিস’ বলে। তখন অন্য লক্ষণ যেমন: ক্লান্তি, প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া, পেট ফাঁপা, বা হালকা জ্বর থাকতে পারে। তবে নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র উপায় রক্ত পরীক্ষা। যদি কারো ঝুঁকি থাকে (যেমন হেপাটাইটিসের সংস্পর্শ, পারিবারিক ইতিহাস, নিয়মিত ওষুধ সেবন), তাহলে নিয়মিত চেকআপ করানো ভালো। কোনো লক্ষণ ছাড়াই বিলিরুবিন বেড়ে গেলে তা গিলবার্ট সিনড্রোম বা অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

বিলিরুবিন কমানোর জন্য ঘরোয়া কোনো উপায় আছে কি? খাবারে কী পরিবর্তন আনতে হবে?

বিলিরুবিন কমানোর জন্য সরাসরি কোনো ঘরোয়া প্রতিকার নেই, তবে লিভারের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কিছু অভ্যাস সাহায্য করতে পারে। প্রচুর পানি পান করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, এবং চর্বিজাতীয় ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলা লিভারের কাজ সহজ করে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বীট, গাজর, পেঁপে, এবং লেবুজাতীয় ফল লিভারের ডিটক্সিফিকেশনে সহায়ক হতে পারে। তবে মনে রাখবেন, বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ চিহ্নিত না করে শুধু খাবার দিয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। জন্ডিস বা বিলিরুবিন বেশি থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং নিজে থেকে কোনো ভেষজ বা ঘরোয়া পদ্ধতি শুরু করবেন না।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: