বাচ্চা না হলে কি কি টেস্ট করতে হয়

Rate this post

বন্ধ্যাত্ব একটি জটিল সমস্যা, যার সঠিক কারণ নির্ণয় না করে কোনো চিকিৎসা শুরু করা উচিত নয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষার মাধ্যমে পুরুষ ও নারী উভয়ের প্রজননক্ষমতা মূল্যায়ন করা সম্ভব। এই নির্দেশিকায় আমরা সেই টেস্টগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করবো, যাতে আপনি সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।

Table of Contents

বন্ধ্যাত্ব কী এবং কখন টেস্ট শুরু করবেন?

বন্ধ্যাত্ব বলতে সাধারণত এক বছর নিয়মিত ও অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কের পরও গর্ভধারণ না করাকে বোঝায়। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য ঝুঁকির কারণ বিবেচনায় নিয়ে আগেও টেস্ট শুরু করা যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক দম্পতি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না, কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। গাইনোকোলজিস্ট বা ফার্টিলিটি স্পেশালিস্টের কাছে গেলে তিনি প্রয়োজনীয় টেস্টের পরামর্শ দেবেন।

পুরুষের জন্য প্রয়োজনীয় টেস্ট

পুরুষের প্রজননক্ষমতা নির্ণয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট হলো সেমেন অ্যানালাইসিস বা শুক্রাণু পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা ও আকৃতি মূল্যায়ন করা হয়। সাধারণত ২-৭ দিনের বীর্যপাত বিরতির পর নমুনা সংগ্রহ করতে হয়। প্রয়োজনে হরমোন প্রোফাইল (FSH, LH, টেস্টোস্টেরন) ও জিনেটিক টেস্টও করা হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেমেন অ্যানালাইসিসই প্রথম ধাপ।

মহিলার জন্য প্রয়োজনীয় টেস্ট

মহিলার প্রজননক্ষমতা মূল্যায়নে বেশ কয়েকটি টেস্ট করা হয়। প্রথমত, ওভুলেশন ট্র্যাকিং—যাতে ডিম্বস্ফোটন হচ্ছে কিনা তা বোঝা যায়। এরপর হরমোন প্রোফাইল (FSH, LH, ইস্ট্রাডিওল, প্রোজেস্টেরন, থাইরয়েড হরমোন, প্রোল্যাকটিন) রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। পেলভিক আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে জরায়ু, ডিম্বাশয় ও ফলিকলের অবস্থা দেখা হয়। টিউব ব্লকেজ সন্দেহ হলে হিস্টেরোসালপিংগ্রাফি (HSG) করা হয়, যেখানে এক্স-রে বা আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ডিম্বনালির পেটেন্সি পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজনে ল্যাপারোস্কোপির মাধ্যমে সরাসরি পেলভিক অঙ্গ পর্যবেক্ষণ করা যায়।

টেস্টের খরচ ও সময়সীমা (বাংলাদেশ)

নিচের খরচগুলি আনুমানিক এবং ল্যাব, শহর ও প্যাকেজের ভিত্তিতে পরিবর্তিত হতে পারে। বর্তমান মূল্য নিশ্চিত করে নিন।

বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ের মূল টেস্ট ও আনুমানিক খরচ (বেসরকারি ল্যাব)
টেস্টের নাম উদ্দেশ্য আনুমানিক খরচ (বেসরকারি ল্যাবে) মন্তব্য
সেমেন অ্যানালাইসিস শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা ও আকৃতি মূল্যায়ন ৫০০-২,০০০ টাকা ২-৭ দিন বিরতি প্রয়োজন
ওভুলেশন ট্র্যাকিং (LH কিট) ডিম্বস্ফোটনের সময় নির্ণয় ২০০-১,০০০ টাকা (প্রতি কিট) বাড়িতেও করা যায়
হরমোন প্রোফাইল (FSH, LH, ইত্যাদি) হরমোনের মাত্রা মূল্যায়ন ১,৫০০-৪,০০০ টাকা (প্রতি প্যানেল) সাধারণত রক্তপরীক্ষা
পেলভিক আল্ট্রাসাউন্ড জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের গঠন পর্যবেক্ষণ ১,০০০-২,৫০০ টাকা ট্রান্সভ্যাজাইনাল বা পেটের ওপর
হিস্টেরোসালপিংগ্রাফি (HSG) ডিম্বনালির ব্লকেজ নির্ণয় ৩,০০০-৮,০০০ টাকা এক্স-রে বা আল্ট্রাসাউন্ড গাইডেড
ল্যাপারোস্কোপি পেলভিক অঙ্গের সরাসরি পর্যবেক্ষণ ১০,০০০-২০,০০০ টাকা (প্রক্রিয়া অনুযায়ী) সাধারণত অ্যানেস্থেসিয়ার প্রয়োজন

দ্রষ্টব্য: খরচগুলি আনুমানিক এবং ল্যাব, শহর ও প্যাকেজের ভিত্তিতে পরিবর্তিত হতে পারে। বর্তমান মূল্য নিশ্চিত করে নিন।

কখন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন?

যদি প্রাথমিক টেস্টের পর কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে, অথবা এক বছর চেষ্টার পরও সন্তান না হয়, তাহলে দেরি না করে একজন গাইনোকোলজিস্ট বা ফার্টিলিটি স্পেশালিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে বয়স ৩৫-এর ওপর হলে, অথবা পরিচিত কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। মনে রাখবেন, বন্ধ্যাত্ব নির্ণয় ও চিকিৎসা একটি যৌথ প্রক্রিয়া—স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

বিভাগ অনুযায়ী ডাক্তার খুঁজুন

আপনার বিভাগে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজতে নিচের লিংকগুলি ব্যবহার করুন।

বিভাগ ডাক্তার খুঁজুন
ঢাকা ঢাকায় জনপ্রিয় শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে ভেরিফাইড শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা খুলনায় শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন
রাজশাহী রাজশাহীতে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর রংপুরে জনপ্রিয় শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
সিলেট সিলেটে ভেরিফাইড শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
বরিশাল বরিশালে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে জনপ্রিয় শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

টেস্ট করার আগে কতদিন চেষ্টা না করে অপেক্ষা করা উচিত?

সাধারণত, কোনো গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ছাড়া এক বছর নিয়মিত শারীরিক সম্পর্কের পরও যদি গর্ভধারণ না হয়, তবে টেস্ট শুরু করার সময় হয়েছে বলে ধরা হয়। তবে মহিলার বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে ছয় মাস অপেক্ষার পরই টেস্ট করানো বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া যদি মাসিক অনিয়মিত হয়, আগে পেলভিক ইনফেকশন বা সার্জারির ইতিহাস থাকে, তাহলে অপেক্ষা না করে সরাসরি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

এই টেস্টগুলো করতে কি আগে থেকে কোনো প্রস্তুতি দরকার (যেমন রোজা রাখা)?

কিছু টেস্টের জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন। যেমন—পুরুষের সেমেন অ্যানালাইসিসের আগে ২-৫ দিন বীর্যপাত থেকে বিরত থাকতে হয়। মহিলার হরমোন পরীক্ষা (FSH, LH ইত্যাদি) সাধারণত মাসিকের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে করতে বলা হয়। আলট্রাসাউন্ডের জন্য পানি পান করে মূত্রথলি ভর্তি রাখার প্রয়োজন হতে পারে। তবে সব টেস্টের জন্য আলাদা নির্দেশনা থাকে। তাই নির্দিষ্ট টেস্টের আগে আপনার ডাক্তার বা ল্যাবের দেওয়া নির্দেশনা ভালোভাবে মেনে চলুন।

টেস্টের ফলাফল স্বাভাবিক আসলে কী বোঝায়? তাহলে সমস্যা কোথায়?

উভয়ের টেস্ট স্বাভাবিক আসার মানে এই নয় যে সবকিছু ঠিক। একে ‘ইউনএক্সপ্লেনড ইনফার্টিলিটি’ (অব্যক্ত বন্ধ্যাত্ব) বলা হয়। এর মানে হতে পারে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনে কোনো জৈবরাসায়নিক বাধা আছে, বা ইমপ্লান্টেশন প্রক্রিয়ায় সমস্যা, অথবা এখনো অজ্ঞাত কোনো কারণ। সেক্ষেত্রে ডাক্তার আরও উন্নত টেস্ট (যেমন জিনেটিক স্ক্রিনিং, হিস্টেরোস্কোপি, ইমিউনোলজিক্যাল টেস্ট) বা সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি (যেমন IUI, IVF) শুরু করার পরামর্শ দিতে পারেন।

বাংলাদেশে কি পুরুষের অলস শুক্রাণু বা জিনেটিক টেস্ট করানো যায়? সরকারি হাসপাতালে করলে কি খরচ কম হয়?

হ্যাঁ, বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর (ঢাকা, চট্টগ্রাম) কিছু সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অলস শুক্রাণু (স্পার্ম মরফোলজি/মোটিলিটি) এবং বেসিক জিনেটিক টেস্ট (যেমন ক্যারিওটাইপিং) করানো যায়। সরকারি হাসপাতালে খরচ অনেক কম, তবে অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হতে পারে। বেসরকারি ল্যাবে স্পার্ম মরফোলজির খরচ ৫০০-১৫০০ টাকা, আর জিনেটিক টেস্টের খরচ ৩০০০-১০০০০ টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে কোনো জটিল জিনেটিক টেস্ট (যেমন মাইক্রোডিলিশন) বাংলাদেশের সব জায়গায় সহজলভ্য নয়; সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে বিদেশি ল্যাবে পাঠাতে হতে পারে।

টেস্টের পর বিষণ্নতা বা সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিলে কী করা উচিত?

বন্ধ্যাত্বের টেস্ট ও চিকিৎসা মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এটি স্বাভাবিক। প্রথমত, আপনার সঙ্গীর সাথে খোলামেলা কথা বলুন। প্রয়োজনে একজন কাউন্সেলর বা সাইকোলজিস্টের সাহায্য নিন। বাংলাদেশে কিছু ফার্টিলিটি সেন্টার ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কাপল কাউন্সেলিং দেন। দীর্ঘমেয়াদি চাপ হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাই নিজের মেন্টাল হেলথকে উপেক্ষা করবেন না। মনে রাখবেন, বন্ধ্যাত্ব দম্পতির সমস্যা, শুধু একজনের নয়—সুতরাং একজন আরেকজনকে দোষ না দিয়ে একসঙ্গে কাজ করাটাই সবচেয়ে জরুরি।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: