গর্ভধারণের আগে কি কি পরীক্ষা করানো উচিত?

Rate this post

গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন? তাহলে কিছু পরীক্ষা আগে করিয়ে নেওয়া মা ও শিশুর জন্য নিরাপদ। তবে সব পরীক্ষা সবার জন্য জরুরি নয়—বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসক ঠিক করবেন। এই গাইডে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণত কী কী পরীক্ষা করানো হয়, কেন করাবেন, এবং আনুমানিক খরচ কেমন হতে পারে তা সহজ ভাষায় বলা হবে।

Table of Contents

গর্ভধারণের আগে পরীক্ষা করানো কেন জরুরি?

অনেক জটিলতা আগে থেকে ধরা পড়লে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধ করা যায়। যেমন—থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার ধরা পড়লে সতর্কতা নেওয়া যায়, রুবেলা ইমিউনিটি না থাকলে টিকা নেওয়া যায়, আর ডায়াবেটিস বা থাইরয়েড থাকলে চিকিৎসা নিয়ে গর্ভধারণ করা যায়। এতে গর্ভপাত, অকাল প্রসব, বা শিশুর জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি অনেকটাই কমে।

শুধু নারী নন, পুরুষেরও কিছু পরীক্ষা করানো সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বন্ধ্যাত্ব বা জিনগত সমস্যার অনেক কারণ পুরুষের শরীরেও থাকে। তাই দম্পতি হিসেবে একসঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।

নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো

নিচের পরীক্ষাগুলো সাধারণত গর্ভধারণের আগে করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে আপনার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও পারিবারিক ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক আরও কিছু পরীক্ষা যোগ করতে পারেন।

  • রক্তের গ্রুপ ও আরএইচ ফ্যাক্টর: মা ও শিশুর রক্তের গ্রুপের অসামঞ্জস্যতা (Rh ইনকম্প্যাটিবিলিটি) এড়াতে।
  • কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC) ও হিমোগ্লোবিন: রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া) আছে কিনা জানতে।
  • থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার স্ক্রিনিং: বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ারের হার বেশি; এটি শিশুর জন্য মারাত্মক হতে পারে।
  • থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট (TSH, FT4): থাইরয়েডের সমস্যা গর্ভপাত বা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
  • রক্তে শর্করা (FBS বা HbA1c): ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস ধরা পড়লে গর্ভাবস্থায় জটিলতা এড়ানো যায়।
  • রুবেলা অ্যান্টিবডি (IgG): রুবেলা ইমিউনিটি না থাকলে গর্ভধারণের আগে টিকা নিতে হবে।
  • হেপাটাইটিস বি ও সি, সিফিলিস (VDRL), এইচআইভি: সংক্রমণ থাকলে শিশুর সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
  • ইউরিন R/E: মূত্রনালির সংক্রমণ বা প্রোটিন লস আছে কিনা জানতে।
  • টক্সোপ্লাজমা (যদি ঝুঁকি থাকে): বিড়ালের সংস্পর্শে থাকলে বা কাঁচা মাংস খেলে এই পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

পুরুষের কী কী পরীক্ষা করানো উচিত?

অনেক দম্পতি শুধু নারীর পরীক্ষা করান, কিন্তু পুরুষের স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিচের পরীক্ষাগুলো পুরুষের জন্য প্রযোজ্য:

  • স্পার্ম গ্রাফ (বীর্য পরীক্ষা): শুক্রাণুর সংখ্যা, গঠন ও গতিশীলতা জানতে। বন্ধ্যাত্বের প্রায় অর্ধেক কারণ পুরুষের থাকে।
  • থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার স্ক্রিনিং: নারী ও পুরুষ উভয়েই ক্যারিয়ার হলে শিশুর থ্যালাসেমিয়া মেজর হওয়ার ঝুঁকি ২৫%।
  • রক্তের গ্রুপ ও আরএইচ ফ্যাক্টর: নারীর আরএইচ নেগেটিভ হলে পুরুষের আরএইচ জানা জরুরি।
  • সংক্রমণ পরীক্ষা (হেপাটাইটিস বি ও সি, সিফিলিস, এইচআইভি): যৌন সংক্রমণের মাধ্যমে শিশুতে ছড়াতে পারে।

পুরুষের জন্য এই পরীক্ষাগুলো করানো সময় ও অর্থের অপচয় নয়, বরং একটি সুস্থ সন্তানের সম্ভাবনা বাড়ায়।

কখন ও কীভাবে পরীক্ষাগুলো করাবেন?

গর্ভধারণের অন্তত ৩-৬ মাস আগে পরীক্ষাগুলো করানো ভালো। কারণ কিছু পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে টিকা নিতে হয় (যেমন রুবেলা টিকা নেওয়ার পর ১ মাস গর্ভধারণ এড়িয়ে চলতে হয়) বা কোনো রোগ নিয়ন্ত্রণে সময় লাগে।

বাংলাদেশের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে এই পরীক্ষাগুলো করা যায়। তবে নিজে থেকে তালিকা তৈরি করে পরীক্ষা করানোর আগে অবশ্যই একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। চিকিৎসক আপনার বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করবেন। অনেক ল্যাবে ‘প্রেগন্যান্সি প্ল্যানিং প্যাকেজ’ নামে কম্বো অফার থাকে, যা খরচ কিছুটা কমাতে পারে।

পরীক্ষার আনুমানিক খরচ (বাংলাদেশ)

নিচের টেবিলে কয়েকটি সাধারণ পরীক্ষার আনুমানিক খরচ দেওয়া হলো। মনে রাখবেন, খরচ ল্যাবের মান, শহর ও প্যাকেজের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। নির্দিষ্ট ল্যাবে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়ে নিন।

পরীক্ষার নাম উদ্দেশ্য আনুমানিক খরচ (বিডিটি) মন্তব্য
রক্তের গ্রুপ ও আরএইচ ফ্যাক্টর গ্রুপ ও Rh নির্ণয় ২০০-৫০০ সাধারণত কম্বো প্যাকেজে থাকে
কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC) রক্তস্বল্পতা, সংক্রমণ ইত্যাদি ৪০০-৮০০ হিমোগ্লোবিন আলাদাভাবেও করানো যায়
থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার স্ক্রিনিং Hb electrophoresis বা HPLC ১,০০০-২,৫০০ দম্পতি উভয়ের জন্য প্রয়োজন
থাইরয়েড ফাংশন (TSH) থাইরয়েডের কার্যকারিতা ৫০০-১,২০০ FT4 প্রয়োজন হলে খরচ বাড়ে
রক্তে শর্করা (FBS) ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং ১৫০-৪০০ HbA1c করালে খরচ ৬০০-১,২০০
রুবেলা অ্যান্টিবডি (IgG) ইমিউনিটি পরীক্ষা ৮০০-১,৫০০ টিকা নেওয়ার আগে করানো হয়
হেপাটাইটিস বি (HBsAg) সংক্রমণ শনাক্ত ৪০০-৮০০ হেপাটাইটিস সি আলাদা
সিফিলিস (VDRL) যৌন সংক্রমণ ২০০-৫০০ গর্ভাবস্থায়ও করানো হয়
এইচআইভি (ELISA) এইচআইভি শনাক্ত ৫০০-১,২০০ গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়
ইউরিন R/E মূত্রনালির সংক্রমণ ১৫০-৩০০ সাধারণ পরীক্ষা
স্পার্ম গ্রাফ (পুরুষ) শুক্রাণুর গুণাগুণ ১,০০০-২,০০০ ৩-৫ দিন বিরত থাকতে হবে

দ্রষ্টব্য: খরচ পরিবর্তনশীল; নিশ্চিত হওয়ার আগে ল্যাবে যোগাযোগ করুন।

পরীক্ষার পরবর্তী পদক্ষেপ: টিকা ও সাপ্লিমেন্ট

পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসক যা পরামর্শ দিতে পারেন:

  • রুবেলা টিকা: যদি ইমিউনিটি না থাকে, তাহলে গর্ভধারণের অন্তত ১ মাস আগে টিকা নিতে হবে।
  • হেপাটাইটিস বি টিকা: যদি সংক্রমণ না থাকে কিন্তু ইমিউনিটি না থাকে, তাহলে টিকা নেওয়া জরুরি।
  • ফোলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট: গর্ভধারণের ৩ মাস আগে থেকে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ মাইক্রোগ্রাম ফোলিক অ্যাসিড নেওয়া শিশুর নিউরাল টিউব ত্রুটি প্রতিরোধে সহায়ক।
  • বিদ্যমান রোগ নিয়ন্ত্রণ: ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ওষুধ ও জীবনযাত্রার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

মনে রাখবেন, কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট নিজে থেকে শুরু করবেন না—সবকিছু চিকিৎসকের পরামর্শে করুন।

বিভাগ অনুযায়ী ডাক্তার খুঁজুন

গর্ভধারণের আগে পরীক্ষা ও পরামর্শের জন্য আপনি আপনার বিভাগে মেডিসিন বা শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজে নিতে পারেন। নিচের টেবিলে বিভাগ অনুযায়ী লিংক দেওয়া হলো:

বিভাগ ডাক্তার খুঁজুন
ঢাকা ঢাকায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে টপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা খুলনায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন
রাজশাহী রাজশাহীতে ভেরিফাইড মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর রংপুরে ভেরিফাইড মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
সিলেট সিলেটে ভেরিফাইড মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
বরিশাল বরিশালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

গর্ভধারণের আগে পরীক্ষাগুলো কি বাধ্যতামূলক? সবাইকে কি করতেই হবে?

না, এগুলো বাধ্যতামূলক নয়। তবে বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, আগের কোনো রোগ বা জটিলতা থাকলে চিকিৎসক পরীক্ষাগুলো করার পরামর্শ দেবেন। অনেক ক্ষেত্রে সুস্থ ও ঝুঁকিমুক্ত দম্পতির জন্য সব পরীক্ষার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তাই নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে একজন গাইনোকোলজিস্ট বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো ঠিক করা ভালো।

আমি যদি ইতিমধ্যে গর্ভবতী হয়ে থাকি, তাহলে কি এই পরীক্ষাগুলো করানো যাবে?

গর্ভধারণের আগের পরীক্ষাগুলো সাধারণত কনসেপশনের আগে করানো হয়। আপনি যদি ইতিমধ্যে গর্ভবতী হন, তাহলে প্রি-কনসেপশন পরীক্ষার বদলে প্রসবপূর্ব (এন্টিন্যাটাল) পরীক্ষাগুলো করানো উচিত। যেমন—রক্তের গ্রুপ, হিমোগ্লোবিন, থাইরয়েড, ডায়াবেটিস, হেপাটাইটিস বি, সিফিলিস ইত্যাদি। তবে কোনো পরীক্ষা করানোর আগে অবশ্যই আপনার গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিন।

বাংলাদেশে কি সব ল্যাবে এই পরীক্ষাগুলো করা যায়? আনুমানিক খরচ কেমন?

হ্যাঁ, বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারেই প্রি-কনসেপশন পরীক্ষার প্যানেল পাওয়া যায়। তবে গ্রামাঞ্চলে কিছু বিশেষ পরীক্ষা (যেমন—থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং, জিনগত পরীক্ষা) সীমিত হতে পারে। খরচ নির্ভর করে ল্যাবের মান ও পরীক্ষার সংখ্যার ওপর। সাধারণত বেসিক প্যানেল (রক্ত পরীক্ষা, ইউরিন আরই, ব্লাড গ্রুপ, থাইরয়েড, হেপাটাইটিস) এর জন্য ২,০০০-৫,০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। আরও বিশেষায়িত পরীক্ষা যুক্ত হলে খরচ বাড়ে। সঠিক খরচ জানতে নির্দিষ্ট ল্যাবে যোগাযোগ করুন।

গর্ভধারণের আগে জিনগত (জেনেটিক) পরীক্ষা করানো কি জরুরি?

সবার জন্য জরুরি নয়। জিনগত পরীক্ষা তখনই বিবেচনা করা হয় যখন পরিবারে থ্যালাসেমিয়া, সিকেল সেল অ্যানিমিয়া, হিমোফিলিয়া বা অন্য কোনো বংশগত রোগের ইতিহাস থাকে। অথবা যদি আগের গর্ভধারণে জিনগত সমস্যা ধরা পড়ে। সাধারণত চিকিৎসক পারিবারিক ইতিহাস ও শারীরিক অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেন। নিজে থেকে জিনগত পরীক্ষা করানোর আগে জেনেটিক কাউন্সেলিং নেওয়া ভালো।

পরীক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক না হলে কী করবেন?

প্রথমত, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অনেক অস্বাভাবিক ফলাফল চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, থাইরয়েড সমস্যা, ডায়াবেটিস বা রক্তস্বল্পতা থাকলে ওষুধ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত হওয়া সম্ভব। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী আরও পরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দেবেন। ফলাফল নিয়ে সরাসরি আপনার গাইনোকোলজিস্ট বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করুন এবং তাঁর পরামর্শ মেনে চলুন।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: