রক্তরোগে প্লীহা বড় হয়ে যাওয়ার কারণ কী?

Rate this post

আপনি বা আপনার পরিবারের কারও পেটের বাঁ দিকে ফোলাভাব বা অস্বস্তি হচ্ছে? ডাক্তার হয়তো বলেছেন প্লীহা বড় হয়েছে। কিন্তু কেন? রক্তরোগের কারণেই কি এমন হচ্ছে? এই নিবন্ধে আমরা রক্তরোগের কারণে প্লীহা বড় হওয়ার নির্দিষ্ট কারণগুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব। প্লীহা বড় হওয়া নিজে কোনো রোগ নয়, বরং অন্তর্নিহিত কোনো রোগের ইঙ্গিত। বিশেষ করে রক্তের বিভিন্ন রোগে প্লীহা আকারে বেড়ে যেতে পারে। আসুন জেনে নিই কীভাবে এবং কেন এমন হয়।

প্লীহা বড় হওয়া কী এবং কেন রক্তরোগে এটি ঘটে?

প্লীহা আমাদের পেটের বাঁ দিকে, পাঁজরের নিচে অবস্থিত একটি ছোট অঙ্গ। এর কাজ হলো পুরনো বা অস্বাভাবিক রক্তকণিকা ভেঙে ফেলা, রক্ত ফিল্টার করা এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করা। রক্তরোগের কারণে প্লীহা বড় হওয়ার পেছনে তিনটি প্রধান প্রক্রিয়া কাজ করে:

  • কনজেশন (Congestion): রক্তকণিকার অস্বাভাবিক উৎপাদন বা ধ্বংসের ফলে প্লীহার ভেতরে অতিরিক্ত রক্তকণিকা জমে যায়, যা অঙ্গটিকে ফুলিয়ে তোলে। যেমন—হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়ায় লোহিত কণিকা ভেঙে যাওয়ার পর প্লীহায় জমে।
  • এক্সট্রামেডুলারি হেমাটোপয়েসিস (Extramedullary hematopoiesis): অস্থিমজ্জা যখন ঠিকমতো রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না, তখন প্লীহা সেই কাজ গ্রহণ করে। ফলে প্লীহায় নতুন রক্তকণিকা তৈরি হতে থাকে এবং এটি বড় হয়ে যায়। থ্যালাসেমিয়ায় এটি সাধারণ ঘটনা।
  • ইনফিলট্রেশন (Infiltration): ক্যান্সার কোষ (যেমন লিউকেমিয়া বা লিম্ফোমার কোষ) প্লীহার টিস্যুতে প্রবেশ করে এবং অঙ্গটিকে বড় করে তোলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে থ্যালাসেমিয়া ও সিকেল সেল ডিজিজের কারণে প্লীহা বড় হওয়া বেশি দেখা যায়। এই রোগগুলোতে অস্থিমজ্জা থেকে অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি হয়, যা লোহিত কণিকাকে ভঙ্গুর করে এবং প্লীহায় জমা হতে থাকে।

কোন কোন রক্তরোগে প্লীহা বড় হয়?

নিচের টেবিলে প্রধান রক্তরোগগুলো এবং প্লীহা বড় হওয়ার প্রক্রিয়া তুলে ধরা হলো:

রোগের নাম প্লীহা বড় হওয়ার প্রক্রিয়া অন্যান্য লক্ষণ বাংলাদেশে প্রাদুর্ভাব
থ্যালাসেমিয়া এক্সট্রামেডুলারি হেমাটোপয়েসিস ও কনজেশন রক্তস্বল্পতা, ক্লান্তি, মুখের হাড়ের পরিবর্তন অত্যন্ত সাধারণ (ক্যারিয়ার প্রায় ৭%)
সিকেল সেল ডিজিজ কনজেশন (ভঙ্গুর লোহিত কণিকা জমা) ব্যথার ক্রাইসিস, জন্ডিস, সংক্রমণ কিছু অঞ্চলে (বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট)
হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া কনজেশন (লোহিত কণিকার অতিরিক্ত ধ্বংস) জন্ডিস, গাঢ় প্রস্রাব, ক্লান্তি মাঝারি
লিউকেমিয়া (তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী) ইনফিলট্রেশন (শ্বেত কণিকার ক্যান্সার কোষ) জ্বর, রক্তপাতের প্রবণতা, সংক্রমণ বিরল কিন্তু গুরুতর
লিম্ফোমা ইনফিলট্রেশন (লিম্ফোসাইটের ক্যান্সার) লসিকা গ্রন্থি ফোলা, ওজন কমা, রাতের ঘাম বিরল
মায়েলোফাইব্রোসিস এক্সট্রামেডুলারি হেমাটোপয়েসিস (অস্থিমজ্জায় ফাইব্রোসিস) পেট ফোলা, ক্লান্তি, রক্তস্বল্পতা অত্যন্ত বিরল

উল্লেখ্য, লিভার সিরোসিস বা সংক্রমণের মতো অ-রক্তজনিত কারণেও প্লীহা বড় হতে পারে, তবে এই নিবন্ধে আমরা শুধু রক্তরোগের কারণ নিয়ে আলোচনা করছি।

প্লীহা বড় হলে কী কী লক্ষণ দেখা দেয়?

প্লীহা বড় হওয়ার লক্ষণগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে হালকা বা একেবারে না-ও থাকতে পারে। তবে সাধারণত নিচের বিষয়গুলো দেখা যায়:

  • পেটের বাঁ দিকে ফোলাভাব বা চাপ অনুভব
  • খাওয়ার পর তাড়াতাড়ি পেট ভরাট লাগা (অল্প খেতেই পেট ভরে যাওয়া)
  • পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি (বিশেষ করে বাঁ দিকে)
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা (রক্তস্বল্পতার কারণে)
  • বারবার সংক্রমণ (প্লীহার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে)
  • সহজে রক্তপাত বা ক্ষত (প্লেটলেট কমে গেলে)

মনে রাখবেন, অনেক সময় প্লীহা বড় হলেও কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষায় বা অন্য কোনো কারণে পেটের আল্ট্রাসাউন্ড করলে এটি ধরা পড়ে।

রোগ নির্ণয়ের জন্য কী কী পরীক্ষা করা হয়?

প্লীহা বড় হয়েছে সন্দেহ হলে ডাক্তার সাধারণত নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করেন:

  1. শারীরিক পরীক্ষা: ডাক্তার পেট চেপে দেখে প্লীহা বড় কিনা তা বোঝার চেষ্টা করেন।
  2. রক্ত পরীক্ষা (সিবিসি ও পেরিফেরাল স্মিয়ার): লোহিত কণিকা, শ্বেত কণিকা ও প্লেটলেটের সংখ্যা দেখে রক্তস্বল্পতা বা অস্বাভাবিক কোষ শনাক্ত করা যায়। থ্যালাসেমিয়া সন্দেহ হলে হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরেসিস (Hb electrophoresis) করা হয়।
  3. পেটের আল্ট্রাসাউন্ড: প্লীহার আকার ও আকৃতি নিশ্চিত করতে এবং অন্যান্য অঙ্গের অবস্থা দেখতে।
  4. সিটি স্ক্যান বা এমআরআই: প্রয়োজনে আরও বিস্তারিত চিত্র পাওয়ার জন্য।
  5. বোন ম্যারো বায়োপসি: লিউকেমিয়া বা মায়েলোফাইব্রোসিসের মতো রোগ নিশ্চিত করতে অস্থিমজ্জার নমুনা পরীক্ষা।

বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার শনাক্তের জন্য এইচবি ইলেক্ট্রোফোরেসিস পরীক্ষাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসা ও করণীয়

প্লীহা বড় হওয়ার চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে মূল রোগের ওপর নির্ভর করে। তাই সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য একজন হেমাটোলজিস্টের (রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ) পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিচে কিছু সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো (শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে):

  • থ্যালাসেমিয়া: নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন ও আয়রন চেলেশন থেরাপি।
  • লিউকেমিয়া/লিম্ফোমা: কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট।
  • হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া: স্টেরয়েড বা ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ওষুধ।
  • প্লীহা অপসারণ (স্প্লেনেক্টমি): কিছু ক্ষেত্রে প্লীহা এত বড় হয়ে যায় যে ওষুধে কাজ হয় না, তখন প্লীহা অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এটি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই আগে নিউমোকক্কাল, মেনিনজোকক্কাল ও হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা নেওয়া জরুরি।

গুরুত্বপূর্ণ: নিজে কোনো ওষুধ বা ঘরোয়া প্রতিকার শুরু করবেন না। সবকিছু ডাক্তারের পরামর্শে করুন।

বিভাগ অনুযায়ী রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন

প্লীহা বড় হওয়ার কারণ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য একজন অভিজ্ঞ হেমাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। নিচের টেবিলে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের তালিকা দেওয়া হলো:

বিভাগ ডাক্তার খুঁজুন
ঢাকা ঢাকায় রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা খুলনায় রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রাজশাহী রাজশাহীতে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর রংপুরে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
সিলেট সিলেটে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
বরিশাল বরিশালে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

রক্তরোগের চিকিৎসা করালে কি প্লীহার বড় ভাব কমে যায়?

হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রেই অন্তর্নিহিত রক্তরোগের সফল চিকিৎসার পর প্লীহার আকার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে। যেমন, লিউকেমিয়া বা লিম্ফোমার কেমোথেরাপি বা টার্গেট থেরাপির পর প্লীহা ছোট হতে দেখা যায়। তবে কিছু রোগে (যেমন মাইলোফাইব্রোসিস) প্লীহা স্থায়ীভাবে বড় থাকতে পারে এবং শুধু উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য চিকিৎসা চলতে থাকে। পূর্ণ সঙ্কোচন কতটা হবে তা নির্ভর করে রোগের ধরন, চিকিৎসার প্রতিক্রিয়া এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার উপর।

প্লীহা বড় হওয়া মানেই কি ক্যান্সার বা গুরুতর রক্তরোগ?

না, সবসময় নয়। প্লীহা বড় হওয়ার অনেক কারণ আছে—সংক্রমণ (যেমন ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু), লিভারের রোগ (যেমন সিরোসিস), বা কিছু অটোইমিউন অবস্থা। তবে রক্তরোগের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তাই প্লীহা বড় ধরা পড়লে ডাক্তার রক্ত পরীক্ষা, ইমেজিং এবং প্রয়োজনে বোন ম্যারো বায়োপসির মাধ্যমে কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। নিজে থেকে উদ্বিগ্ন না হয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

প্লীহা বড় থাকলে কোন কোন কাজ এড়িয়ে চলা উচিত?

প্লীহা বড় থাকলে এটি ফেটে যাওয়ার (rupture) ঝুঁকি বেড়ে যায়, বিশেষ করে পেটে আঘাত লাগলে। তাই কন্টাক্ট স্পোর্টস (যেমন ফুটবল, কাবাডি, বক্সিং) বা ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া পেটের বাঁ পাশে চাপ পড়ে এমন কাজও সতর্কতার সাথে করতে হবে। ডাক্তার সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সীমা (যেমন প্লীহার আকার ২০ সেন্টিমিটারের বেশি) পর্যন্ত শারীরিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেন।

প্লীহা বড় হলে কি অপারেশন (স্প্লেনেক্টমি) করাতে হয়? কখন জরুরি?

সব ক্ষেত্রে অপারেশন প্রয়োজন হয় না। সাধারণত ওষুধ বা চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণ না এলে, প্লীহা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে, বা রক্তশূন্যতা/প্লেটলেট কমে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিলে স্প্লেনেক্টমি বিবেচনা করা হয়। তবে প্লীহা অপসারণের পর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়, তাই নিউমোকক্কাল, মেনিনগোকক্কাল ও হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (Hib) ভ্যাকসিন আগে নেওয়া জরুরি। সিদ্ধান্ত সবসময় হেমাটোলজি ও সার্জারি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নিতে হবে।

রক্তরোগের রোগী হিসেবে প্লীহার আকার কতদিন পরপর পরীক্ষা করানো উচিত?

এটি নির্ভর করে রোগের ধরন ও স্থিতিশীলতার উপর। উদাহরণস্বরূপ, ক্রনিক লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া (CLL) বা মাইলোফাইব্রোসিসের রোগীদের সাধারণত প্রতি ৩-৬ মাসে আল্ট্রাসাউন্ড বা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে প্লীহার আকার পর্যবেক্ষণ করা হয়। তবে চিকিৎসা চলাকালীন বা নতুন উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তার আরও ঘন ঘন পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। নিজে থেকে ব্যবধান ঠিক না করে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলাই নিরাপদ।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: