গর্ভাবস্থায় বমি বমি ভাব কমানোর উপায়?

Rate this post

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস বমি বমি ভাব (মর্নিং সিকনেস) একটি খুব সাধারণ অভিজ্ঞতা। এটি মা ও শিশু উভয়ের জন্যই অস্বস্তিকর হলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি স্বাভাবিক এবং নিজে থেকেই সেরে যায়। এই আর্টিকেলে আমরা কিছু সহজ, নিরাপদ এবং কার্যকরী ঘরোয়া উপায় নিয়ে আলোচনা করব যা আপনাকে এই সময়টা একটু সহজে কাটাতে সাহায্য করবে, পাশাপাশি কখন ডাক্তার দেখানো জরুরি সেটাও জানাবো।

Table of Contents

গর্ভাবস্থায় বমি বমি ভাব কেন হয়?

গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে শরীরে হরমোনের মাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে, বিশেষ করে হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন (এইচসিজি) নামক হরমোন। এই হরমোনের বৃদ্ধি ওঠানামার সঙ্গেই বমি বমি ভাবের সম্পর্ক রয়েছে। অনেকের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রাও প্রভাব ফেলে। এটা জেনে রাখা জরুরি যে, বমি বমি ভাবের উপস্থিতি সাধারণত গর্ভাবস্থা ঠিকমতো এগিয়ে যাওয়ার একটি ইঙ্গিত। বেশিরভাগ নারীর ক্ষেত্রেই ১২-১৪ সপ্তাহের মধ্যে এই উপসর্গ কমে যায় বা চলে যায়।

সকালের বমি ভাব কমাতে কার্যকরী ঘরোয়া টিপস

বমি ভাব পুরোপুরি দূর করা না গেলেও কিছু অভ্যাস একে অনেকটাই সহনীয় করে তুলতে পারে। নিচে কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ের একটি তালিকা দেওয়া হলো:

করণীয় (করুন) বর্জনীয় (এড়িয়ে চলুন)
বিছানা থেকে ওঠার আগে ২-৩ টি বিস্কুট বা টোস্ট খান সকালে খালি পেটে চা, কফি বা ভারী খাবার খাবেন না
সারাদিনে ৫-৬ বার অল্প পরিমাণে খাবার খান একবারে অনেক খেয়ে পেট ভর্তি করে ফেলবেন না
আদা চা, আদা কুঁচি মেশানো পানি বা লেবু পানি পান করুন তীব্র গন্ধযুক্ত খাবার (যেমন মাছ ভাজা, পেঁয়াজ, রসুন) কাছে রাখবেন না
প্রচুর পানি ও তরল খাবার (ডালের পানি, স্যুপ) পান করুন তৈলাক্ত, ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত মসলাদার খাবার খাবেন না

বমি বমি ভাবের সময় ঘর ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল করে এমন রাখা, আরামদায়ক পোশাক পরা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়াও খুব কাজে দেয়।

খাদ্যাভ্যাস: কী খাবেন আর কী এড়াবেন?

খাবারের ধরন পরিবর্তন করলেই বমি ভাব অনেকটা কমে যেতে পারে। সহায়ক কিছু খাবার হলো:

  • প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার: ডিম, দই, ডাল, বাদাম ইত্যাদি। প্রোটিন পেট অনেকক্ষণ ভরা রাখে এবং বমি ভাব কমায়।
  • ঠান্ডা বা ঘরের তাপমাত্রার খাবার: গরম খাবারের গন্ধ বমি ভাব বাড়ায়, তাই ঠান্ডা দই, ফলের স্যালাড বা ঘরের তাপমাত্রার ভাত খেতে পারেন।
  • কলা ও ভাত: কলায় প্রচুর পটাশিয়াম থাকে যা ডিহাইড্রেশন ঠেকাতে পারে। সাধারণ ভাত বা খিচুড়ি সহজপাচ্য।
  • লেবু ও টক ফল: লেবুর টক গন্ধ ও স্বাদ বমি ভাব কমাতে পরিচিত। কাঁচা আম বা টক দইও কাজ করে। তবে অতিরিক্ত টক বা কাঁচা ফল পেটের জন্য ভালো নয়—সীমিত পরিমাণে খান।

অন্যদিকে, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা, মিষ্টি জিনিস বেশি খাওয়া, ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এবং গন্ধযুক্ত তেল বা মসলা এড়িয়ে চলাই ভালো।

প্রচলিত ভুল ধারণা ও সতর্কতা

বাংলাদেশে গর্ভাবস্থায় বমি বমি ভাব নিয়ে কিছু পুরনো ধারণা আছে। যেমন—’বমি হলে বাচ্চার ক্ষতি হয়’ বা ‘জোর করে খেতে হবে’। আসলে, মাঝারি মাত্রার বমি বমি ভাব ভ্রূণের ক্ষতি করে না; বরং মায়ের অস্বস্তি বাড়ায় আর জোর করে খাওয়া উল্টে বমি বাড়াতে পারে। আরেকটি প্রচলিত অভ্যাস হলো কাঁচা আম বা সুপারি দিয়ে বমি ভাব কমানো। একটু টক খাওয়া দোষের না, কিন্তু অতিরিক্ত কাঁচা আম বা সুপারি দাঁতের জন্য ক্ষতিকর, আর সুপারিতে থাকা কিছু উপাদান গর্ভাবস্থায় নিরাপদ নয়। সবচেয়ে ভালো হয় প্রাকৃতিক ও সহজলভ্য জিনিস (যেমন বিস্কুট, ভাত, ডাবের পানি) দিয়ে পেট ভরা রাখা এবং কোনো বাড়তি কিছু চিবানোর আগে ডাক্তারের মতামত নেওয়া।

কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?

সাধারণ বমি বমি ভাবের চেয়ে বেশি কিছু হলে বা নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। নিচের টেবিলটি লক্ষণ বুঝতে সাহায্য করবে:

লক্ষণ করণীয়
মাঝে মাঝে বমি বমি ভাব, খেতে ও পানি পান করতে পারছেন, ওজন কমছে না ঘরোয়া ব্যবস্থা নিন। চিন্তা না করে নিয়মিত ফলো-আপ করান।
দিনে কয়েকবার বমি, কোনো কিছুই মুখে রাখতে পারছেন না, ওজন কমছে, প্রস্রাব কমে গেছে, মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে বা দুর্বল লাগছে এগুলো হাইপারইমেসিস গ্রাভিডারামের লক্ষণ। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং সম্ভবত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে তরল ও পুষ্টি নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

মনে রাখবেন, এই অবস্থায় দেরি না করে ডাক্তার দেখানোই নিরাপদ। চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না।

ভিটামিন বি৬ ও অন্যান্য ওষুধ: ডাক্তারের পরামর্শ আবশ্যক

অনেক ডাক্তার বমি বমি ভাব কমাতে ভিটামিন বি৬ (পাইরিডক্সিন) খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তবে সেটাও নির্দিষ্ট মাত্রায় এবং প্রয়োজনে। নিজে থেকে ফার্মেসি থেকে কিনে খাওয়া ঠিক নয়, কারণ অতিরিক্ত ভিটামিন বি৬ নার্ভের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। এছাড়া অন্য কোনো ঘরোয়া ওষুধ বা ভেষজ খাওয়ার আগেও অবশ্যই একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের সাথে কথা বলে নিন।

বিভাগ অনুযায়ী গাইনোকলজিস্ট ডাক্তার খুঁজুন

বমি বমি ভাব নিয়ে যদি নিয়মিত চেকআপ বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে চান, তাহলে আপনার বিভাগের একজন গাইনোকলজিস্টের সাহায্য নিতে পারেন। নিচের টেবিলে বিভাগ অনুযায়ী ডাক্তার তালিকা দেওয়া হলো:

বিভাগ ডাক্তার খুঁজুন
ঢাকা ঢাকায় গাইনোকলজিস্ট ডাক্তার
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে গাইনোকলজিস্ট ডাক্তার
খুলনা খুলনায় গাইনোকলজিস্ট ডাক্তার
রাজশাহী রাজশাহীতে গাইনোকলজিস্ট ডাক্তার
রংপুর রংপুরে গাইনোকলজিস্ট ডাক্তার
সিলেট সিলেটে গাইনোকলজিস্ট ডাক্তার
বরিশাল বরিশালে গাইনোকলজিস্ট ডাক্তার
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে গাইনোকলজিস্ট ডাক্তার

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

বমি বমি ভাব কমাতে কি ঘরোয়া উপায় হিসেবে আদা বা লেবু খাওয়া নিরাপদ?

হ্যাঁ, সাধারণ পরিমাণে আদা (যেমন আদা চা বা বিস্কুট) এবং লেবুর গন্ধ বা লেবু পানি বেশিরভাগ গর্ভবতীর জন্য নিরাপদ বলে মনে করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে অল্প পরিমাণ আদা বমি ভাব কমাতে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত আদা (প্রতিদিন ১ গ্রামের বেশি) বা লেবুর রস খালি পেটে না খাওয়াই ভালো। আপনার যদি কোনো জটিলতা যেমন গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থাকে, তাহলে ব্যবহারের আগে একবার ডাক্তারকে জানিয়ে নেওয়া ভালো। কোনো ভেষজ বা ঘরোয়া উপাদানই ওষুধের বিকল্প নয়।

মর্নিং সিকনেস কি শুধু সকালেই হয়, নাকি সারাদিন থাকতে পারে?

‘মর্নিং সিকনেস’ নাম শুনে অনেকেই ভাবেন এটি শুধু সকালে হয়, কিন্তু বাস্তবে এটি দিনের যেকোনো সময়ে হতে পারে। অনেক নারীর সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বমি ভাব বেশি হয়, আবার কারও সন্ধ্যায় বা রাতেও হয়। আবার কারও সারাদিন ধরে হালকা অস্বস্তি থাকতে পারে। তাই ‘সকালের বমি ভাব’ বলে ভেবে অবহেলা না করে দিনের যেকোনো সময়ে লক্ষণ দেখা দিলেই প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া জরুরি।

গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাস পেরিয়ে গেলেও যদি বমি বমি ভাব না কমে, তাহলে কী করব?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১২-১৪ সপ্তাহের মধ্যে বমি ভাব নিজে থেকেই কমে যায় বা পুরোপুরি চলে যায়। তবে কিছু নারীর ক্ষেত্রে এটি দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিক পর্যন্তও থাকতে পারে। যদি ৩ মাস পরেও বমি ভাব তীব্র থাকে, স্বাভাবিক খাবার বা পানি গ্রহণে বাধা দেয়, অথবা ওজন কমতে থাকে, তাহলে অবশ্যই গাইনোকলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ এটি ‘হাইপারেমেসিস গ্র্যাভিডারাম’ নামক একটি জটিল অবস্থার লক্ষণ হতে পারে, যার চিকিৎসা প্রয়োজন।

বমির কারণে যদি পর্যাপ্ত পানি ও খাবার গ্রহণ করতে না পারি, তাহলে কি কোনো বিপদ হতে পারে?

হ্যাঁ, পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টি না নেওয়ার কারণে ডিহাইড্রেশন (শরীরে পানি শূন্যতা), ইলেক্ট্রোলাইট imbalance, পুষ্টিহীনতা এবং ওজন কমে যেতে পারে। এর ফলে মা দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন এবং প্রস্রাব কমে যাওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথাঘোরা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। চরম ক্ষেত্রে এটি শিশুর বৃদ্ধিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বারবার অল্প অল্প করে পানি বা স্যালাইন পান করার চেষ্টা করুন। যদি কোনোভাবেই পানি ধরে রাখতে না পারেন, তাহলে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

গর্ভাবস্থায় বমি বমি ভাব বা বমি কি শিশুর কোনো ক্ষতি করতে পারে?

গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক বমি বমি ভাব সাধারণত শিশুর জন্য ক্ষতিকর নয়। শরীর এই সময়ে হরমোনজনিত পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয় এবং শিশু প্ল্যাসেন্টা থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে থাকে। তবে যদি বমি এতই তীব্র হয় যে মা পর্যাপ্ত খাবার ও পানি গ্রহণ করতে পারছেন না এবং ওজন দ্রুত কমছে, তাহলে শিশুর পুষ্টি ও বৃদ্ধি প্রভাবিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বেশিরভাগ মর্নিং সিকনেস নিরাপদ, কিন্তু তীব্র বমিকে অবহেলা করা উচিত নয়।

সারকথা

গর্ভাবস্থায় বমি বমি ভাব অস্থায়ী এবং এটি একা আপনিই নন, অনেক মায়েরই হয়। ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তন, যেমন অল্প অল্প খাওয়া, শুকনো খাবার দিয়ে দিন শুরু করা, এবং আদা-লেবুর মতো প্রাকৃতিক জিনিস ব্যবহার করে আপনি এই সময়টা সহজে পার করতে পারেন। নিজের শরীরের কথা শুনুন, বেশি ক্লান্তি এড়িয়ে চলুন, আর যখন মনে হবে কিছু অস্বাভাবিক—তখন নির্দ্বিধায় ডাক্তারের কাছে যান। এই সময়টা নিজের যত্ন নেওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি। আপনাদের জন্য শুভ কামনা।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: