রক্তে সংক্রমণ হলে লক্ষণ কী?

Rate this post

রক্তে সংক্রমণ (সেপসিস) একটি জরুরি অবস্থা যা দ্রুত চিকিৎসা না করলে জীবনহানির কারণ হতে পারে। অনেক সময় সাধারণ জ্বর বা সংক্রমণকে অবহেলা করলে তা রক্তে ছড়িয়ে পড়ে। এই নিবন্ধে আমরা রক্তে সংক্রমণের সাধারণ লক্ষণ, স্থানীয় সংক্রমণ থেকে পার্থক্য, কখন জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যেতে হবে এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণ কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করব। কোনো লক্ষণ দেখা দিলে নিজে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

রক্তে সংক্রমণ (সেপসিস) কী? কেন এটি বিপজ্জনক?

সেপসিস হলো শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া যা কোনো সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করে। এটি সাধারণত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাকের সংক্রমণ থেকে শুরু হয়। যখন সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শরীরে ব্যাপক প্রদাহ দেখা দেয়, যা রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্ত সরবরাহ কমিয়ে দেয়।

সেপসিস দ্রুত সেপটিক শকে পরিণত হতে পারে, যেখানে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যায় এবং কিডনি, ফুসফুস, লিভারসহ একাধিক অঙ্গ ব্যর্থ হতে শুরু করে। বাংলাদেশে সেপসিসের কারণে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে যাদের দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া যায় না। তাই লক্ষণ চেনা এবং সময়মতো হাসপাতালে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সেপসিসের সাধারণ লক্ষণগুলো কী কী?

সেপসিসের লক্ষণ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে এবং প্রায়শই অন্যান্য রোগের সাথে মিলে যায়। নিচের টেবিলে প্রধান লক্ষণ, তাদের বর্ণনা এবং কখন সেগুলো উদ্বেগজনক তা দেওয়া হলো।

লক্ষণ বর্ণনা কখন উদ্বেগজনক
জ্বর ও ঠান্ডা লাগা শরীরের তাপমাত্রা ১০১° ফারেনহাইটের বেশি বা ৯৬° ফারেনহাইটের কম হতে পারে। প্রচণ্ড ঠান্ডা লাগা ও কাঁপুনি দেখা যায়। জ্বরের সাথে বিভ্রান্তি বা শ্বাসকষ্ট থাকলে
দ্রুত হৃদস্পন্দন বিশ্রামে হৃদস্পন্দন প্রতি মিনিটে ৯০-এর বেশি (প্রাপ্তবয়স্কে)। হৃদস্পন্দন স্থিরভাবে বেশি থাকলে এবং অন্যান্য উপসর্গ থাকলে
দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস প্রতি মিনিটে ২০-এর বেশি শ্বাস নেওয়া। শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বা বুকে চাপ অনুভূত হলে
বিভ্রান্তি বা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হঠাৎ করে বিভ্রান্ত, অস্থির বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। এটি সেপসিসের গুরুতর লক্ষণ; দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে
প্রস্রাব কমে যাওয়া ১২ ঘণ্টায় প্রস্রাব না হওয়া বা খুব কম হওয়া। কিডনি ব্যর্থতার ইঙ্গিত; জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন
ত্বকের পরিবর্তন ত্বক ফ্যাকাশে, নীলাভ বা দাগযুক্ত দেখায়। ঠান্ডা ও আঠালো লাগতে পারে। ত্বকের রং পরিবর্তন হলে বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে
রক্তচাপ কমে যাওয়া মাথা ঘোরা, দাঁড়ালে ঝিম ধরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে (সেপটিক শক)

লক্ষণগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি দেখা দিলে, বিশেষ করে একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে থাকলে, দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

স্থানীয় সংক্রমণ থেকে রক্তে সংক্রমণ কখন ছড়ায়?

যেকোনো স্থানীয় সংক্রমণই যদি সঠিকভাবে চিকিৎসা না করা হয়, তবে তা রক্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি সাধারণ কারণ হলো:

  • নিউমোনিয়া: ফুসফুসের সংক্রমণ দ্রুত রক্তে ছড়াতে পারে, বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে।
  • মূত্রনালির সংক্রমণ (ইউটিআই): কিডনি পর্যন্ত পৌঁছালে সেপসিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • ক্ষত বা পোড়া: অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ক্ষতস্থান সংক্রমিত হলে তা রক্তে প্রবেশ করতে পারে।
  • ডায়াবেটিক পায়ের ঘা: ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ের ছোট ঘাও মারাত্মক সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
  • প্রসবোত্তর সংক্রমণ: প্রসবের পরে জরায়ু বা যোনিপথের সংক্রমণ সেপসিসের অন্যতম সাধারণ কারণ বাংলাদেশে।
  • অস্বাস্থ্যকর ইনজেকশন বা ক্যাথেটার: জীবাণুমুক্ত নয় এমন সিরিঞ্জ বা ক্যাথেটার ব্যবহার করলে সরাসরি রক্তে সংক্রমণ হতে পারে।

এসব ক্ষেত্রে প্রাথমিক সংক্রমণের লক্ষণ (যেমন ক্ষতস্থান লাল হওয়া, জ্বর, প্রস্রাবে জ্বালা) দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি, যাতে তা সেপসিসে পরিণত হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

কখন জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যেতে হবে?

সেপসিস দ্রুত অগ্রসর হয়, তাই নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান:

  • বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
  • শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা শ্বাসের গতি অনেক বেড়ে যাওয়া
  • ১২ ঘণ্টার বেশি প্রস্রাব না হওয়া
  • রক্তচাপ কমে যাওয়ার কারণে দাঁড়াতে না পারা বা মাথা ঘোরা
  • ত্বক নীলাভ বা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
  • জ্বরের সাথে প্রচণ্ড ঠান্ডা লাগা ও কাঁপুনি

বাংলাদেশের অনেক জেলা শহরে ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা পাওয়া যায়; প্রয়োজনে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিকেও প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। মনে রাখবেন, সেপসিসের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট মূল্যবান।

প্রাথমিক চিকিৎসা কেন সময়মতো প্রয়োজন?

সেপসিসের চিকিৎসায় দ্রুত শিরাপথে অ্যান্টিবায়োটিক ও তরল দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি ঘণ্টায় বিলম্ব মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

অনেকেই নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা বিপজ্জনক হতে পারে। ভুল অ্যান্টিবায়োটিক বা ডোজ সংক্রমণকে আরও প্রতিরোধী করে তুলতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে সরাসরি হাসপাতালে যান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিন।

বিভাগ অনুযায়ী চিকিৎসক খুঁজুন

সেপসিসের চিকিৎসায় সাধারণত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ (পালমোনোলজিস্ট) প্রয়োজন হতে পারে। নিচের টেবিলে আপনার বিভাগ অনুযায়ী চিকিৎসকের তালিকা দেওয়া হলো।

বিভাগ বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
ঢাকা ঢাকায় বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ঢাকায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার চট্টগ্রামে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা খুলনায় বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুলনায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রাজশাহী রাজশাহীতে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রাজশাহীতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর রংপুরে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রংপুরে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
সিলেট সিলেটে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সিলেটে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
বরিশাল বরিশালে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বরিশালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার —

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

সাধারণ জ্বর আর রক্তে সংক্রমণের জ্বরের মধ্যে পার্থক্য কীভাবে বুঝব?

সাধারণ ভাইরাল জ্বরের তুলনায় রক্তে সংক্রমণের (সেপসিস) জ্বরের সাথে সাধারণত আরও কিছু লক্ষণ থাকে, যেমন—অস্বাভাবিক দ্রুত হৃদস্পন্দন, শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া, এবং ত্বকে ফুসকুড়ি বা দাগ দেখা দেওয়া। তবে শুধু জ্বরের ধরন দেখে নিজে নির্ণয় করা বিপজ্জনক। যদি জ্বরের সাথে উপরের যেকোনো একটি লক্ষণও দেখা দেয়, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

রক্তে সংক্রমণ হলে কি ঘরোয়া চিকিৎসায় ভালো হওয়া সম্ভব?

না, রক্তে সংক্রমণ (সেপসিস) একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। ঘরোয়া পদ্ধতি যেমন—প্যারাসিটামল খাওয়া, গরম পানি সেঁক দেওয়া, বা ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বরং সময় নষ্ট হলে সংক্রমণ দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে দিতে পারে। একমাত্র হাসপাতালে শিরায় অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসা দিয়েই এই অবস্থা সামাল দেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশে রক্তে সংক্রমণের সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো কী কী?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রক্তে সংক্রমণের সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—অপরিষ্কার কাটাছেঁড়া বা ক্ষতস্থান থেকে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ (ইউটিআই), পেটের ভেতরের সংক্রমণ (যেমন অ্যাপেন্ডিসাইটিস), এবং প্রসূতি মায়ের প্রসবজনিত সংক্রমণ। এছাড়া ডায়াবেটিস, লিভার সিরোসিস বা কিডনি রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুখ থাকলে সংক্রমণ দ্রুত রক্তে ছড়ানোর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

রক্তে সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে কত দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া উচিত?

যেকোনো সন্দেহজনক লক্ষণ (যেমন—জ্বরের সাথে শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, প্রস্রাব কমে যাওয়া, বা রক্তচাপ কমে যাওয়া) দেখা দেওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব, আদর্শভাবে ১-২ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছানো জরুরি। সেপসিস কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেপটিক শকে রূপ নিতে পারে, যা জীবনহানির কারণ হয়। তাই ‘দেখি পরে কী হয়’ করে অপেক্ষা না করে সরাসরি জরুরি বিভাগে যান।

রক্তে সংক্রমণ প্রতিরোধের উপায় কী?

প্রতিরোধের জন্য কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়: (১) যেকোনো কাটাছেঁড়া বা ক্ষতস্থান ভালোভাবে পরিষ্কার করে জীবাণুনাশক লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করা, (২) সংক্রমণের প্রথম লক্ষণে (যেমন—ক্ষতস্থান লাল, ফোলা, পুঁজ) চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, (৩) নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদির টিকা নেওয়া, (৪) ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, এবং (৫) হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে ক্যাথেটার বা ড্রিপের জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার রাখা। মনে রাখবেন, প্রতিরোধই সর্বোত্তম চিকিৎসা।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: