জরায়ু নিচে নেমে আসার লক্ষণ?

Rate this post

জরায়ু নিচে নেমে আসার লক্ষণ নিয়ে অনেক নারীই কারও সঙ্গে আলোচনা করেন না। অথচ এটি খুব বিরল সমস্যা নয়, এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপশম পাওয়া সম্ভব। অনেক সময় মনে হয় ‘ভেতরে যেন কিছু ঝুলছে’ বা ‘যোনিপথে চাপ পড়ছে’—এই অনুভূতিগুলোকে অবহেলা করা ঠিক নয়। এগুলো পেলভিক ফ্লোর পেশির দুর্বলতার কারণে হতে পারে, যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় ইউটেরাইন প্রোল্যাপস বলে।

জরায়ু নিচে নেমে আসা বলতে কী বোঝায়?

জরায়ু সাধারণত পেলভিসের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকে। তাকে ধরে রাখে পেলভিক ফ্লোরের পেশি এবং আশেপাশের লিগামেন্ট। এই পেশি-লিগামেন্ট দুর্বল হয়ে পড়লে জরায়ু ধীরে ধীরে নিচে নেমে যোনিপথের (ভ্যাজাইনা) দিকে চলে আসতে পারে। চিকিৎসা পরিভাষায় একে ইউটেরাইন প্রোল্যাপস বলে।

বিষয়টি যতটা ভয়ের মনে হতে পারে, ততটা বিপজ্জনক নয়—এটি ক্যান্সার বা সংক্রমণ নয়। তবে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করলে অস্বস্তি এবং দৈনন্দিন কাজে বাধা বাড়তে পারে। বারবার প্রসব, বয়সজনিত দুর্বলতা, দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, ভারী জিনিস তোলা এবং অতিরিক্ত ওজন—এসব কারণে পেলভিক ফ্লোরের উপর ধীরে ধীরে চাপ পড়ে।

প্রধান লক্ষণগুলো কী কী?

জরায়ু নিচে নেমে আসার লক্ষণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। প্রাথমিক পর্যায়ে কেউ কেউ কোনো অস্বস্তিই বোধ করেন না; আবার কারও কারও লক্ষণ বেশ স্পষ্ট। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

  • তলপেটে ভারী বা চাপা ভাব: অনেকেই বলেন ‘ভেতরে যেন কিছু ঝুলছে’। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে বা কাজ করলে এই ভাব বাড়ে।
  • যোনিপথে বুলজ বা ফোলা অনুভূতি: যোনির ভেতরে চাপ লাগছে বা বাইরে থেকে কিছু বেরিয়ে আসছে বলে মনে হতে পারে।
  • পিঠের নিচের দিকে টান ধরা ব্যথা: ভারী কাজের পর বা দিনের শেষে ব্যথা বেশি অনুভূত হয়।
  • প্রস্রাবের সমস্যা: ঘন ঘন প্রস্রাব, হাঁচি-কাশি বা হাসলে সামান্য প্রস্রাব চলে যাওয়া, অথবা প্রস্রাব শেষ করতে কষ্ট হওয়া।
  • পায়খানার সমস্যা: কোষ্ঠকাঠিন্য, মল ত্যাগে অতিরিক্ত চাপ দিতে হয়, কিংবা মল সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয় না বলে লাগে।
  • সহবাসের সময় অস্বস্তি বা ব্যথা: এটি একটি কম আলোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

সব লক্ষণ একসঙ্গে নাও থাকতে পারে। মাসিকের সময় বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে অভিযোগ বাড়তে পারে। নিচের টেবিলে সাধারণ লক্ষণগুলোর সাথে অন্যান্য সম্ভাব্য কারণের পার্থক্য দেখানো হলো:

জরায়ু নিচে নেমে আসার সাধারণ লক্ষণ ও অন্যান্য সমস্যার সাথে পার্থক্য
লক্ষণ জরায়ু নিচে নেমে আসায় যেমন হতে পারে অন্যান্য সমস্যায় যেমন হতে পারে
তলপেটে ভারী ভাব দাঁড়ালে বা কাজ করলে বাড়ে, শুয়ে পড়লে কমে পিরিয়ডের ব্যথা বা ফাইব্রয়েডেও হতে পারে
যোনিপথে চাপ/বুলজ ভেতরে কিছু পড়ে থাকার বা বেরিয়ে আসার অনুভূতি ভ্যাজাইনাল সিস্ট, সংক্রমণ বা ফাইব্রয়েডেও হতে পারে
প্রস্রাবের সমস্যা হাঁচি-কাশিতে প্রস্রাব চলে যাওয়া, প্রস্রাব করতে দেরি হয় মূত্রনালির সংক্রমণে জ্বালাপোড়া এবং ঘন ঘন প্রস্রাব হয়
পিঠের নিচে ব্যথা ভারী ভাবের সাথে টান ধরা ব্যথা, দিনের শেষে বেশি মেরুদণ্ড বা স্নায়ুর সমস্যায় দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে পারে
পায়খানার সমস্যা চাপ দিতে হয়, মল আটকে থাকার অনুভূতি হয় পাইলস, ফিশার বা সাধারণ কোষ্ঠকাঠিন্যেও হয়

টেবিলটি শুধু ধারণা দিতে; নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

কাদের বেশি হয়? (ঝুঁকির কারণ)

কিছু শারীরিক অবস্থা এবং জীবনযাপনের অভ্যাস জরায়ু নিচে নেমে আসার ঝুঁকি বাড়াতে পারে:

  • একাধিক বার প্রসব: যোনিপথে প্রসবের সময় পেলভিক ফ্লোরের পেশিতে টান পড়ে। যত বেশি প্রসব, ঝুঁকি তত বেশি।
  • বয়স ও মেনোপজ: মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন কমে গেলে পেশি ও টিস্যু দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
  • ভারী শারীরিক পরিশ্রম: দীর্ঘদিন ভারী জিনিস তোলা বা দাঁড়িয়ে কাজ করা পেটের ভেতরের চাপ বাড়ায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কৃষিকাজ ও গৃহস্থালির ভারী কাজের সঙ্গে এর সম্পর্ক দেখা যায়।
  • দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য: নিয়মিত মল ত্যাগে চাপ দিতে হলে পেলভিক ফ্লোরের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
  • দীর্ঘস্থায়ী কাশি: হাঁপানি, ব্রংকাইটিস বা ধূমপানজনিত দীর্ঘ কাশির কারণেও চাপ বাড়তে পারে।
  • স্থূলতা: অতিরিক্ত ওজন পেটের ভেতরের চাপ বাড়িয়ে দেয়।

ঝুঁকির কারণ থাকলেই যে সমস্যা হবেই, তা নয়; তবে নিয়মিত চেকআপ করিয়ে লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা ভালো।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ:

  • যোনিপথে স্পষ্ট বুলজ বা কোনো কিছু বেরিয়ে আসার অনুভূতি
  • দৈনন্দিন কাজে বাধা দেওয়ার মতো তলপেটে ভারী ভাব বা পিঠে ব্যথা
  • প্রস্রাব চলে যাওয়া, প্রস্রাব করতে কষ্ট, বা বারবার প্রস্রাবের বেগ
  • পায়খানা নিয়ন্ত্রণ বা মল ত্যাগে সমস্যা
  • সহবাসের সময় ব্যথা বা অস্বস্তি

এছাড়া হঠাৎ যোনিপথ থেকে রক্তপাত, তীব্র পেটে বা পিঠে ব্যথা, জ্বর কিংবা প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া—এ ধরনের অবস্থায় দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। এ লক্ষণগুলো অন্য কোনো জটিলতার কারণেও হতে পারে।

লক্ষণ একদম না থাকলেও যাদের ঝুঁকির কারণ আছে, তাদের নিয়মিত পেলভিক চেকআপ করানো ভালো। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসা অনেক সহজ হয়।

বিভাগ অনুযায়ী ডাক্তার খুঁজুন

জরায়ু নিচে নেমে আসার সমস্যায় মূলত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ লাগে। তবে দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো কারণ যদি থাকে, তবে সেই বিশেষজ্ঞদের চিকিৎসাও জরুরি। আপনার বিভাগের বক্ষব্যাধি বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের তালিকা নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো:

বিভাগ ডাক্তার খুঁজুন
ঢাকা ঢাকায় বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ঢাকা ঢাকায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা খুলনায় বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা খুলনায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রাজশাহী রাজশাহীতে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রাজশাহী রাজশাহীতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর রংপুরে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর রংপুরে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
সিলেট সিলেটে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
সিলেট সিলেটে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
বরিশাল বরিশালে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
বরিশাল বরিশালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার

চিকিৎসার বিকল্পগুলো কী?

জরায়ু নিচে নেমে আসার চিকিৎসা নির্ভর করে সমস্যার মাত্রা, রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার উপর। চিকিৎসা মানেই যে অস্ত্রোপচার, তা নয়।

  • পেলভিক ফ্লোর ব্যায়াম (কেগেল): নিয়মিত কেগেল ব্যায়াম পেলভিক পেশি শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষজ্ঞ বা ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে শুরু করলে ভালো হয়।
  • পেসারি: এটি একটি নরম সিলিকন যন্ত্র, যা যোনিপথে স্থাপন করে জরায়ুকে ঠিক জায়গায় রাখা হয়। ডাক্তার এটি বসিয়ে দেন এবং নিয়মিত পরিষ্কার করতে হয়।
  • লাইফস্টাইল পরিবর্তন: কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে আঁশযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত পানি এবং সুষম খাদ্য; ভারী ওজন না তোলা; দীর্ঘস্থায়ী কাশির সঠিক চিকিৎসা; ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • অস্ত্রোপচার: গুরুতর বা উন্নত পর্যায়ে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। কোন পদ্ধতিতে অপারেশন হবে, তা সম্পূর্ণভাবে রোগীর অবস্থা দেখে ডাক্তার নির্ধারণ করবেন।

মনে রাখবেন, জরায়ু নিচে নেমে আসা একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। লজ্জা বা ভয়ে না থেকে একজন অভিজ্ঞ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রসবের পর জরায়ু নিচে নেমে আসার লক্ষণ দেখা দিলে কী করা উচিত?

সন্তান প্রসবের পর পেলভিক ফ্লোর পেশি দুর্বল পড়তে পারে, তাই হালকা উপসর্গ দেখা দিলেই আতঙ্কিত না হয়ে গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রথম দিকে পেলভিক ফ্লোর ব্যায়াম (কেগেল) সাহায্য করতে পারে, তবে ভারী ওঠানামা বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা এড়িয়ে চলা ভালো। চিকিৎসক পরীক্ষার পর উপযুক্ত পরামর্শ দেবেন; ঠিকমতো যত্ন নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বড় কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।

জরায়ু নিচে নেমে এলে কি স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব?

এটি জরায়ু নিচে নেমে আসার মাত্রার ওপর নির্ভর করে। হালকা বা মাঝারি প্রল্যাপস থাকলেও অনেকে স্বাভাবিক প্রসব করতে পারেন, কিন্তু গর্ভাবস্থায় পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে পারে। তাই পরিবার পরিকল্পনার আগে এবং গর্ভাবস্থায় গাইনোকোলজিস্টের নিয়মিত তত্ত্বাবধানে থাকা জরুরি। প্রসব পদ্ধতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন চিকিৎসকই, রোগীর শারীরিক অবস্থা ও শিশুর অবস্থা দেখে।

তলপেটে ব্যথা বা প্রস্রাবের সমস্যা কি জরায়ু নিচে নেমে আসার লক্ষণ?

হ্যাঁ, জরায়ু নিচে নেমে এলে তলপেটে চাপ, ব্যথা, ঘন ঘন প্রস্রাব, প্রস্রাবের চাপ অনুভব বা হঠাৎ প্রস্রাব চলে যাওয়ার ঘটনা দেখা দিতে পারে। তবে এই উপসর্গ অন্য কারণেও হতে পারে, যেমন ইউরিন ইনফেকশন বা জরায়ুর প্রদাহ। তাই নিজে থেকে ধরে না নিয়ে পরীক্ষা করিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই সঠিক।

কেগেল ব্যায়াম কি জরায়ু নিচে নেমে আসা নিরাময় করতে পারে?

কেগেল বা পেলভিক ফ্লোর ব্যায়াম পেলভিক পেশি শক্তিশালী করে, যা হালকা প্রল্যাপসের উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে এবং বড় ধরনের প্রল্যাপস প্রতিরোধে সহায়ক। তবে এটি সব ক্ষেত্রে নিরাময়ের নিশ্চয়তা নয়; মাঝারি বা গুরুতর প্রল্যাপসে চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে। শুরুর আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের কাছ থেকে সঠিক নিয়ম শিখে নেওয়া ভালো।

জরায়ু নিচে নেমে আসা কি ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে?

জরায়ু নিচে নেমে আসা মূলত পেলভিক পেশি ও লিগামেন্ট দুর্বল হওয়ার কারণে হয়, এটি ক্যান্সারের সরাসরি লক্ষণ নয়। তবে এই সময় অস্বাভাবিক রক্তপাত, স্রাব বা তীব্র ব্যথা থাকলে সেটি ক্যান্সার বা অন্য জরায়ুর রোগের লক্ষণও হতে পারে। তাই কোনো অস্বাভাবিকতাই অবহেলা না করে অবশ্যই গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: