গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ হলে করণীয়?

Rate this post

প্রশ্নটা শুনে অনেকেরই ধারণা, ‘রক্তচাপ একটু বেড়েছে, ঘরে বসে লবণ কম খেলেই হবে।’ কিন্তু গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। এটি প্রি-ইক্লাম্পসিয়ার মতো গুরুতর জটিলতার শুরুর সংকেত হতে পারে, যেখানে মা ও গর্ভের শিশু—দু’জনেরই জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই নিবন্ধে ধাপে ধাপে বলা হয়েছে রক্তচাপ বাড়লে কী করবেন, কোন লক্ষণে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন এবং কীভাবে নিরাপদ ডেলিভারির পরিকল্পনা করতে হবে।

Table of Contents

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ কেন ঝুঁকিপূর্ণ?

গর্ভধারণের আগে থেকেই কারও রক্তচাপ বেশি থাকতে পারে, আবার গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহের পর প্রথমবারও বাড়তে পারে। অনেক সময় রক্তচাপের সঙ্গে প্রস্রাবে প্রোটিন বা লিভার-কিডনির সমস্যা যুক্ত হয়; এই অবস্থাকে প্রি-ইক্লাম্পসিয়া বলে। এটি নিয়ন্ত্রণে না রাখলে পরবর্তী ধাপে খিঁচুনি বা এক্লাম্পসিয়া, এমনকি HELLP সিনড্রোম পর্যন্ত হতে পারে।

ঝুঁকি দেখানোর জন্য নয়, বরং বোঝানোর জন্য বলা হচ্ছে—উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় নীরব থাকে। হঠাৎ গর্ভের শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া, মায়ের অস্বস্তি বা খুব বেশি ফুলে যাওয়া—এসবই ভেতরে জটিলতা বাড়ার লক্ষণ হতে পারে। তাই একবার রক্তচাপ স্বাভাবিক দেখলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না; নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের ফলোআপই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ।

প্রথম করণীয়: চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রক্তচাপ মনিটরিং

বাসায় রক্তচাপ মেপে বারবার ১৪০/৯০ মিমি এইচজি বা তার বেশি দেখলে সেদিনই গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিন। নিজে থেকে কোনো ওষুধ খাওয়া বা আগের ওষুধ চালিয়ে যাওয়া—দুটোই বিপজ্জনক। ডাক্তারই ঠিক করবেন কোন পরীক্ষা ও কোন ওষুধ আপনার জন্য নিরাপদ।

প্রতিটি প্রসবপূর্ব চেকআপে রক্তচাপ মাপা, প্রস্রাবের প্রোটিন পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি দেখা হয়। এই ফলোআপগুলো নির্দিষ্ট সময়ে করানোই সবচেয়ে বড় করণীয়। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় নিরাপদ অ্যান্টি-হাইপারটেনসিভ ওষুধ দিয়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তবে সেটা শুধু চিকিৎসকের পরামর্শেই।

এছাড়া ঢাকাসহ সারা দেশে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিকে কম খরচে নিয়মিত গর্ভকালীন চেকআপের ব্যবস্থা আছে। কাছের সরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অন্তত একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে থাকুন।

ঘরে কোন বিষয়গুলো মেনে চলবেন?

চিকিৎসা যতটা প্রয়োজন, ঘরের যত্নও ততটাই জরুরি—তবে শর্ত হলো, ঘরোয়া ব্যবস্থা কখনোই চিকিৎসার বিকল্প নয়।

  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন; একটানা দাঁড়িয়ে কাজ বা ভারী কিছু বহন করবেন না।
  • প্রচুর পানি পান করুন; তবে ডাক্তার যদি পানির পরিমাণ সীমিত করতে বলেন, শুধু তাঁর নির্দেশই মানুন।
  • লবণ কম খান; অতিরিক্ত লবণ দেওয়া খাবার, আচার ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।
  • খালি পেটে দীর্ঘক্ষণ থাকবেন না; পরিমিত পুষ্টিকর খাবার ছোট ছোট ভাগে খান।
  • ধূমপান ও মদ্যপান গর্ভাবস্থায় সম্পূর্ণ বর্জনীয়।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ঘরোয়া টোটকা বা বাজারের ভেষজ পণ্যের উপর ভরসা করবেন না। ডাক্তারের অনুমতি ছাড়া এসব খেলে ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া হতে পারে। সন্দেহ থাকলে চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করুন, আর বাসায় বসে নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন না।

কোন লক্ষণ দেখলে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন?

রক্তচাপ বেশি বুঝলেই শুধু ফোনে পরামর্শ নেওয়া যথেষ্ট নয়। নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালে যান। জরুরি অবস্থায় ফোনে সময় না কাটিয়ে সরাসরি হাসপাতালে পৌঁছান—এটাই নিরাপদ।

সতর্ক লক্ষণ কী করতে হবে
প্রচণ্ড মাথাব্যথা এখনই হাসপাতালে যান
ঝাপসা দৃষ্টি, চোখে মাছি ওড়া বা অন্ধকার দেখা এখনই হাসপাতালে যান
পাঁজরের নিচে বা উপরের পেটে তীব্র ব্যথা এখনই হাসপাতালে যান
হঠাৎ মুখ, হাত-পা বা পুরো শরীর ফুলে যাওয়া এখনই হাসপাতালে যান
প্রস্রাব কমে যাওয়া বা প্রস্রাবে রক্ত এখনই হাসপাতালে যান
খিঁচুনি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এখনই হাসপাতালে যান
গর্ভের শিশুর নড়াচড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এখনই হাসপাতালে যান

এই লক্ষণগুলো প্রি-ইক্লাম্পসিয়া বা এর জটিলতার দিকে ইঙ্গিত করতে পারে। শাশুড়ি বা প্রতিবেশীর অভিজ্ঞতা শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নেই; অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়নই চূড়ান্ত।

বিভাগ অনুযায়ী ডাক্তার খুঁজুন: হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

উচ্চ রক্তচাপ পরিচালনায় গর্ভকালীন চিকিৎসকের পাশাপাশি মেডিসিন বা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শও কারও কারও ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে। আপনার বিভাগের ডাক্তারদের তালিকা নিচের টেবিলে দেওয়া হলো।

বিভাগ ডাক্তার খুঁজুন
ঢাকা (হৃদরোগ) ঢাকায় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
চট্টগ্রাম (হৃদরোগ) চট্টগ্রামে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা (হৃদরোগ) খুলনায় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রাজশাহী (হৃদরোগ) রাজশাহীতে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর (হৃদরোগ) রংপুরে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
সিলেট (হৃদরোগ) সিলেটে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
বরিশাল (হৃদরোগ) বরিশালে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ময়মনসিংহ (হৃদরোগ) ময়মনসিংহে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ঢাকা (মেডিসিন) ঢাকায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
চট্টগ্রাম (মেডিসিন) চট্টগ্রামে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা (মেডিসিন) খুলনায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রাজশাহী (মেডিসিন) রাজশাহীতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর (মেডিসিন) রংপুরে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
সিলেট (মেডিসিন) সিলেটে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
বরিশাল (মেডিসিন) বরিশালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার

গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি ও ডেলিভারি পরিকল্পনা

উচ্চ রক্তচাপ থাকলে গর্ভের শিশুর বেড়ে ওঠা প্রভাবিত হতে পারে। প্লাসেন্টায় রক্ত চলাচল কমে গেলে শিশু অপুষ্ট বা ছোট হয়ে জন্মাতে পারে। তাই ডাক্তার নির্দিষ্ট সময় অন্তর আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে শিশুর ওজন, তরলের পরিমাণ এবং গতিবিধি দেখে নেবেন।

ডেলিভারির সময় ও পদ্ধতি নির্ধারণ করবেন চিকিৎসক—তা স্বাভাবিক হবে নাকি সিজারিয়ান, সেটা আপনার রক্তচাপ, শিশুর অবস্থা এবং গর্ভাবস্থার সপ্তাহের উপর নির্ভর করে। অবস্থা গুরুতর হলে ৩৭ সপ্তাহের আগেই প্রসব করাতে হতে পারে; এতে শিশুর ঝুঁকির চেয়ে মায়ের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষাই প্রধান বিবেচনা। এই পরিকল্পনা মেনে চলা এবং প্রসবের আগে কাছের হাসপাতালের জরুরি সেবা কেমন, তা আগে জেনে রাখা ভালো।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ কত হলে স্বাভাবিক আর কত হলে উচ্চ রক্তচাপ ধরা হয়?

সাধারণত গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ ১২০/৮০ mmHg-এর নিচে থাকলে তা স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। কিন্তু যদি সিস্টোলিক (উপরের সংখ্যা) ১৪০ বা তার বেশি এবং ডায়াস্টোলিক (নিচের সংখ্যা) ৯০ বা তার বেশি হয়, তাহলে সেটি উচ্চ রক্তচাপ। তবে শুধু একবার মাপলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়—চিকিৎসক অন্তত কয়েকবার মেপে নিশ্চিত হন। গর্ভাবস্থায় রক্তচাপের মাত্রা নিয়ে নিজে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে অবশ্যই নিয়মিত প্রসূতি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কি সিজারিয়ান সেকশন করতে হবে?

সব ক্ষেত্রে নয়। উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও অনেক মা স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিতে পারেন, যদি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং গর্ভের শিশুর কোনো ঝুঁকি না থাকে। তবে প্রি-ইক্লাম্পসিয়া বা অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসক নিরাপদ ডেলিভারির জন্য সিজারিয়ানের পরামর্শ দিতে পারেন। সিদ্ধান্ত নির্ভর করে আপনার রক্তচাপের মাত্রা, গর্ভের শিশুর অবস্থা এবং ডেলিভারির সময়ের ওপর। তাই নির্ধারিত চেকআপে চিকিৎসকের সঙ্গে ডেলিভারি প্ল্যান নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন।

প্রি-ইক্লাম্পসিয়া হলে কি বাচ্চার কোনো ক্ষতি হতে পারে?

হ্যাঁ, প্রি-ইক্লাম্পসিয়া মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। মায়ের রক্তচাপ বেড়ে গেলে প্লাসেন্টায় রক্ত সরবরাহ কমে যেতে পারে, যার ফলে গর্ভের শিশু পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি না পেয়ে ধীরে বাড়তে পারে (IUGR)। কিছু ক্ষেত্রে অকাল প্রসব বা কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তবে নিয়মিত মনিটরিং, সময়মতো চিকিৎসা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডেলিভারির পরিকল্পনা করলে বেশিরভাগ শিশু সুস্থ থাকে। কোনো লক্ষণ (যেমন মাথাব্যথা, ঝাপসা দৃষ্টি, পেটের উপরের দিকে ব্যথা) দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যান।

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খাওয়া কি নিরাপদ?

গর্ভাবস্থায় সব রক্তচাপের ওষুধ নিরাপদ নয়। কিছু ওষুধ (যেমন ACE ইনহিবিটর বা ARB) গর্ভের শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে চিকিৎসক গর্ভাবস্থায় নিরাপদ বলে প্রমাণিত ওষুধ যেমন মিথাইলডোপা, ল্যাবেটালল বা নিফেডিপিন লিখে দিতে পারেন। নিজে থেকে কোনো ওষুধ বন্ধ করা বা ডোজ কমানো উচিত নয়। ওষুধের প্রয়োজনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে শুধুমাত্র আপনার চিকিৎসকই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কি বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে?

হ্যাঁ, সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও বুকের দুধ খাওয়ানো নিরাপদ এবং উৎসাহিত করা হয়। তবে কিছু রক্তচাপের ওষুধ স্তনের দুধে অল্প পরিমাণে আসতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ ওষুধ শিশুর জন্য ক্ষতিকর নয়। চিকিৎসক আপনার ওষুধের ধরন অনুযায়ী পরামর্শ দেবেন। বুকের দুধ খাওয়ানো মায়ের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হতে পারে। তবে প্রসবের পরও রক্তচাপ মনিটর করতে হবে, কারণ কিছু মায়ের রক্তচাপ প্রসবের পরও বেশি থাকতে পারে।

সারকথা

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণযোগ্য, তবে শর্ত হলো সময়মতো সঠিক চিকিৎসা। নিয়মিত চেকআপে যাওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং সতর্ক লক্ষণ দেখলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া—এই তিনটি অভ্যাসই মা ও শিশুকে সুরক্ষিত রাখে। ঘরের টোটকা বা আশপাশের পরামর্শ নয়, অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সিদ্ধান্তই এখানে চূড়ান্ত।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: