যৌনবাহিত রোগের লক্ষণ কি?

Rate this post

যৌনবাহিত রোগ (Sexually Transmitted Infection – STI) নিয়ে সবচেয়ে জটিল বিষয় হলো, এর কোনো একক নির্দিষ্ট লক্ষণ নেই। কারও কারও ক্ষেত্রে শরীরে স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায়, আবার অনেকের ক্ষেত্রে সংক্রমণ সক্রিয় থাকলেও লক্ষণ একেবারেই থাকে না। তাই প্রশ্নটা শুধু নয়—‘কী লক্ষণ দেখলে বুঝবো’—বরং হতে পারে, ‘ঝুঁকি থাকলে পরীক্ষা করাব কি না’।

এই নিবন্ধে যৌনবাহিত রোগের সাধারণ লক্ষণ, লক্ষণহীন সংক্রমণের সত্যটা, কখন ডাক্তার দেখাবেন এবং প্রতিরোধের কার্যকর উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মনে রাখবেন, যৌনবাহিত রোগ কোনো নৈতিক ব্যর্থতা নয়; এগুলো চিকিৎসাযোগ্য সংক্রমণ। এই লেখাটি রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয়, তবে নিজের শরীরে খেয়াল রাখার দিকটা বুঝতে সাহায্য করবে।

যৌনবাহিত রোগের সাধারণ লক্ষণগুলো কী কী?

যৌনবাহিত রোগের উপসর্গ সাধারণত যৌনাঙ্গ, মুখ, গলা বা মলদ্বারে প্রকাশ পায়। সংক্রমণের ধরন ও শরীরের অবস্থা অনুযায়ী লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে। যেসব উপসর্গ প্রায়ই দেখা যায়:

  • যোনি, লিঙ্গ বা মলদ্বার থেকে অস্বাভাবিক স্রাব; রং, ঘনত্ব বা গন্ধ বদলে যাওয়া
  • প্রস্রাবের সময় জ্বালা, ব্যথা বা বারবার প্রস্রাবের চাপ
  • যৌনাঙ্গে, মুখে বা মলদ্বারে ঘা, ফোস্কা, দানা বা চুলকানি
  • কুঁচকির লসিকা গ্রন্থি (লিম্ফ নোড) ফুলে যাওয়া
  • তলপেটে বা পেলভিসে ব্যথা; সহবাসের সময় ব্যথা
  • মহিলাদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত রক্তপাত বা সহবাসের পর রক্তপাত
  • কখনো জ্বর, গলাব্যথা, ক্লান্তি বা ত্বকে র্যাশ—বিশেষ করে সিফিলিস বা এইচআইভির প্রাথমিক পর্যায়ে

এগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি উপসর্গ থাকলেই সেটি যৌনবাহিত রোগ হবে—এমন নয়। প্রস্রাবের সংক্রমণ, ছত্রাকজনিত সমস্যা, অ্যালার্জি বা ত্বকের অন্য অসুখেও অনেক সময় একই ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়। তাই শুধু লক্ষণের ভিত্তিতে নিজে নিজে রোগ শনাক্ত করার চেষ্টা না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই নিরাপদ।

কিছু সাধারণ STI-র লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য

নিচের ছকটি বিভিন্ন সংক্রমণের সাধারণ ধারণা দিতে পারে, তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো দেখা যাবে—এমনটি নয়। লক্ষণ না থাকলেও সংক্রমণ শরীরে থাকতে পারে।

কিছু সাধারণ যৌনবাহিত রোগের সম্ভাব্য লক্ষণ
STI সম্ভাব্য লক্ষণ (সব ক্ষেত্রে নয়) মন্তব্য
ক্ল্যামাইডিয়া প্রায়ই লক্ষণহীন; কারও কারও স্রাব, প্রস্রাবে জ্বালা বা তলপেটে ব্যথা নীরবে থেকে পেলভিক প্রদাহ বা বন্ধ্যত্বের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে
গনোরিয়া অস্বাভাবিক স্রাব, প্রস্রাবে জ্বালা, গলা বা মলদ্বারে অস্বস্তি অনেক সময় উপসর্গহীন, তাই সঙ্গীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে
সিফিলিস প্রথম ধাপে ব্যথাহীন ঘা; পরে ত্বকে র্যাশ, জ্বর, ক্লান্তি ঘা বা র্যাশ সেরে গেলেও চিকিৎসা ছাড়া সংক্রমণ থেকে যায়
হারপিস যৌনাঙ্গে বা মুখে ব্যথাসহ ফোস্কা বা ঘা, চুলকানি, জ্বালা প্রথম সংক্রমণে জ্বর ও অস্বস্তি হতে পারে; ভাইরাস শরীরে দীর্ঘস্থায়ী হয়
এইচপিভি সাধারণত কোনো লক্ষণ নেই; কোনো কোনো ধরনে আঁচিল দেখা দিতে পারে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ধরন ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত
এইচআইভি প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্লু-জাতীয় উপসর্গ; পরে দীর্ঘ সময় লক্ষণহীন একমাত্র রক্ত পরীক্ষাতেই শনাক্ত করা সম্ভব

রোগ নির্ণয়ের জন্য কোনো অনলাইন লক্ষণ-তালিকা যথেষ্ট নয়। প্রস্রাব, রক্ত বা সোয়াব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া ছাড়া চিকিৎসা শুরু করা উচিত নয়।

লক্ষণ না থাকলেও কি সংক্রমণ ছড়াতে পারে?

হ্যাঁ, পারে। যৌনবাহিত রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা আসলে এখানেই—অনেক সংক্রমণ থাকে নীরবে। ক্ল্যামাইডিয়া, গনোরিয়া, এইচআইভি এবং এইচপিভি অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরে সক্রিয় থাকে। কেউ কেউ মাস বা বছর ধরে জানতেই পারেন না যে তার মধ্যে সংক্রমণ আছে।

লক্ষণ না থাকলেও সংক্রমণ অন্যের শরীরে ছড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে কিছু শারীরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই ‘কোনো সমস্যা নেই মানেই পরীক্ষার দরকার নেই’—এই ধারণাটি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে যাদের নতুন সঙ্গী, একাধিক সঙ্গী, বা যারা গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য নিয়মিত STI স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষা করাতে লজ্জা বা ভয় না পেয়ে সেটাকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে ভাবুন।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

  • উপরে বর্ণিত যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে—স্বল্পমেয়াদি হোক বা দীর্ঘমেয়াদি
  • অরক্ষিত যৌন সম্পর্কের পর, এমনকি লক্ষণ না থাকলেও
  • যৌন সঙ্গীর যৌনবাহিত রোগ ধরা পড়লে বা সন্দেহ হলে
  • নতুন সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক শুরুর আগে
  • গর্ভাবস্থায় বা গর্ভধারণের পরিকল্পনার সময়
  • সহবাসের পর রক্তপাত, তলপেটে ব্যথা বা বারবার সংক্রমণের মতো জটিলতা দেখা দিলে

বাংলাদেশে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং icddr,b-এর মতো প্রতিষ্ঠানে STI নিয়ে পরামর্শ ও পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। যত দেরিতে পরীক্ষা করাবেন, জটিলতা এবং সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা তত বাড়তে পারে। কোনো লক্ষণ থাকলে বা ঝুঁকি মনে হলে দেরি না করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আর নিজে ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য ওষুধ কিনে খাবেন না—ভুল ওষুধ সমস্যা আরও জটিল করে তুলতে পারে।

যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধের উপায়

প্রতিরোধের সেরা সময় হলো সংক্রমণের আগেই। নিচের অভ্যাসগুলো ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে:

  • প্রতিবার সঠিকভাবে কন্ডম ব্যবহার করুন; এটি STI-র ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমায়
  • নতুন বা একাধিক সঙ্গী থাকলে সংক্রমণের লক্ষণ না থাকলেও নিয়মিত STI পরীক্ষা করান
  • এইচপিভি ও হেপাটাইটিস বি টিকা নেওয়ার বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন
  • যৌনাঙ্গে ঘা, স্রাব বা অস্বস্তি থাকা অবস্থায় যৌন সম্পর্ক এড়িয়ে চলুন
  • সঙ্গীর সঙ্গে যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে স্পষ্ট ও সম্মানজনক আলোচনা করুন; পরীক্ষার রিপোর্ট শেয়ার করতে দ্বিধা করবেন না

এছাড়া নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা যৌনস্বাস্থ্যের জন্য অন্য যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

বিভাগ অনুযায়ী ডাক্তার খুঁজুন

যৌনবাহিত রোগের লক্ষণ, পরীক্ষা বা চিকিৎসার বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে চাইলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞই প্রথম যোগাযোগের সঠিক বিকল্প হতে পারেন। নিচে বিভাগ অনুযায়ী ডাক্তার তালিকা দেওয়া হলো:

বিভাগ ডাক্তার খুঁজুন
ঢাকা ঢাকায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
খুলনা খুলনায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রাজশাহী রাজশাহীতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
রংপুর রংপুরে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
সিলেট সিলেটে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
বরিশাল বরিশালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

মুখে বা গলায় কি যৌনবাহিত রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

হ্যাঁ, অনেক যৌনবাহিত রোগ (যেমন গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া, সিফিলিস, হারপিস) ওরাল সেক্সের মাধ্যমে মুখ ও গলায় সংক্রমণ ঘটাতে পারে। লক্ষণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে গলাব্যথা, গিলতে কষ্ট, মুখের ভেতর বা ঠোঁটে ঘা, ফোসকা বা সাদা দাগ। তবে অনেক সময় কোনো লক্ষণই থাকে না। তাই যদি ওরাল সেক্সের মাধ্যমে ঝুঁকি থেকে থাকেন এবং গলা বা মুখে অস্বাভাবিক কিছু অনুভব করেন, তাহলে পরীক্ষা করানো জরুরি।

যৌন সম্পর্কের কত দিন পর STI-র লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

প্রতিটি সংক্রমণের জন্য ইনকিউবেশন পিরিয়ড (সংক্রমণ থেকে লক্ষণ প্রকাশের সময়) ভিন্ন। যেমন গনোরিয়ার লক্ষণ ২-১০ দিনের মধ্যে দেখা দিতে পারে, ক্ল্যামাইডিয়ার ক্ষেত্রে ১-৩ সপ্তাহ, সিফিলিসের প্রাথমিক ঘা সাধারণত ৩-৯০ দিনের মধ্যে হয়। আবার এইচপিভি বা হেপাটাইটিস বি-র লক্ষণ প্রকাশ পেতে মাস বা বছরও লেগে যেতে পারে। সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কের ২-৪ সপ্তাহ পর এবং আবার ৩ মাস পর পরীক্ষা করানো, কারণ অনেক সংক্রমণ প্রাথমিকভাবে লক্ষণহীন থাকে।

লক্ষণ দেখে নিজেই কি STI নির্ণয় করা সম্ভব?

না, লক্ষণ দেখে নিজে নিজে STI নির্ণয় করা সম্ভব নয় এবং এটি বিপজ্জনক হতে পারে। অনেক STI-র লক্ষণ একে অপরের সাথে মিলে যায়, আবার কিছু লক্ষণ (যেমন স্রাব, জ্বালা) অন্যান্য অ-যৌনবাহিত সংক্রমণের কারণেও হতে পারে। সঠিক নির্ণয়ের জন্য ল্যাবরেটরি পরীক্ষা (যেমন প্রস্রাব, রক্ত, সোয়াব) প্রয়োজন। ভুল ধারণা বা স্ব-চিকিৎসা করলে সংক্রমণ জটিল আকার ধারণ করতে পারে এবং অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে। তাই কোনো লক্ষণ দেখা দিলে বা ঝুঁকি থাকলে সরাসরি একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

STI-র লক্ষণ নিজে থেকেই চলে গেলে কি বুঝব যে সংক্রমণ সেরে গেছে?

একেবারেই না। অনেক STI-র লক্ষণ কিছুদিন পর নিজে থেকেই কমে যেতে পারে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে সংক্রমণ শরীর থেকে চলে গেছে। যেমন সিফিলিসের প্রাথমিক ঘা নিজে থেকেই সেরে যায়, কিন্তু সংক্রমণ শরীরে থেকে যায় এবং পরবর্তী ধাপে আরও গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। হারপিসের ফোসকাও সেরে যায় কিন্তু ভাইরাস শরীরেই থাকে। লক্ষণ চলে গেলেও সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা থাকতে পারে। তাই শুধুমাত্র লক্ষণের উপর নির্ভর না করে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ চিকিৎসা সম্পন্ন করা জরুরি।

টয়লেট সিট বা গোসলখানা থেকে কি যৌনবাহিত রোগ হতে পারে?

বেশিরভাগ যৌনবাহিত রোগের জীবাণু শরীরের বাইরে খুব অল্প সময় বাঁচে এবং টয়লেট সিট, তোয়ালে, গোসলখানা বা সুইমিং পুলের মাধ্যমে ছড়ানোর মতো পরিবেশ পায় না। তাই এই ধরনের মাধ্যম থেকে STI হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তবে কিছু সংক্রমণ যেমন পিউবিক লাউস (উকুন) বা স্ক্যাবিস মাইট তোয়ালে বা বিছানার চাদরের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। যৌনবাহিত রোগের মূল কারণ হলো অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক, তাই প্রতিরোধের জন্য কনডম ব্যবহার এবং নিয়মিত পরীক্ষা করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সারকথা

যৌনবাহিত রোগের লক্ষণ মানেই সবসময় সংক্রমণ নয়, আবার লক্ষণ না থাকলেই সংক্রমণ নেই—এটাও ভুল। শরীরের কোনো পরিবর্তনকে অবহেলা না করা এবং ঝুঁকি থাকলে দেরি না করে পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত। লক্ষণ দেখে নিজে রোগ চেনার চেষ্টা না করে ল্যাব পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর ভরসা রাখুন। প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসা অনেক জটিলতা আগেই ঠেকাতে পারে। নিরাপদ থাকুন, নিয়মিত পরীক্ষা করান।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: